ঢাকা, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শেয়ারবাজার ছাড়ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা, লেনদেনে বড় ধস  

২০২৬ মে ১৭ ১৮:০২:১৭

শেয়ারবাজার ছাড়ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা, লেনদেনে বড় ধস
 

নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের শেয়ার বিক্রির হিড়িক দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রি করেছেন।

ডিএসই-র তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও লেনদেনে এক বিশাল অসমতা তৈরি হয়েছে। আলোচ্য মাসে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেখানে ১২৪.১৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন, সেখানে নতুন করে বাজারে বিনিয়োগ করেছেন মাত্র ১২.০৬ কোটি টাকা। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপকেরা ঝুঁকিপূর্ণ বা ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে বিনিয়োগ কমিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় পুঁজি সরিয়ে নিচ্ছেন, যা এই লেনদেনে স্পষ্ট।

এপ্রিলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক অংশগ্রহণও নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে। এই মাসে মোট বিদেশী লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১৩৬.২ কোটি টাকা, যা মার্চ মাসের তুলনায় ঠিক ৫০ শতাংশ কম। লেনদেনের এই ব্যাপক পতন নির্দেশ করে যে, বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কেবল তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রিই করছেন না, বরং নতুন করে শেয়ার কেনার ক্ষেত্রেও চরম অনিহা দেখাচ্ছেন। এর ফলে বাজারে তারল্য বা লেনদেনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সিডিবিএল-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশে অনাবাসী বা প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩,২৪২টিতে। ডিএসই-র তালিকায় থাকা ১৩০টি কোম্পানির মধ্যে এপ্রিল মাসে ১৯টি কোম্পানিতে বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে, ১৪টি কোম্পানিতে সামান্য বেড়েছে এবং ৯৭টি কোম্পানিতে অপরিবর্তিত ছিল।

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এই বিক্রির চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে শেয়ারবাজারে মৌলিকভাবে শক্তিশালী ও বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর ওপর, যা সাধারণত বিদেশী পোর্টফোলিওগুলোর প্রধান আকর্ষণ থাকে। ব্লু-চিপ খ্যাত ওষুধ জায়ান্ট স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে সবচেয়ে বেশি ৪০.৭২ কোটি টাকার বিদেশী পুঁজি প্রত্যাহার হয়েছে। ফলে কোম্পানিটিতে বিদেশী শেয়ার ধারণের হার মার্চের ১৫.৩৩ শতাংশ থেকে কমে এপ্রিলে ১৫.১১ শতাংশে নেমেছে।

একই ধারায় ব্র্যাক ব্যাংক থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ৩৭ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করায় ব্যাংকে তাদের অংশীদারিত্ব ৩৬.৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৬.২২ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া রেনাটা, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ম্যারিকো এবং গ্রামীণফোনের মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদেশী তহবিল বাইরে চলে গেছে।

বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন। এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজাররা রিং শাইন টেক্সটাইল এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক-এ থাকা তাদের অবশিষ্ট সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে সম্পূর্ণ প্রস্থান করেছেন। এর বিপরীতে, একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ন্যশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কিনেছেন। শেয়ার কেনার তালিকায় একমাত্র উল্লেখযোগ্য নাম ছিল বিএসআরএম স্টিলস। কোম্পানিটি ৯.৫০ কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পেরেছে, যার ফলে এর বিদেশী শেয়ার ধারণের হার ০.২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ০.৬০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বিএসআরএম লিমিটেড, প্রাইম ব্যাংক এবং এনভয় টেক্সটাইলেও সামান্য বিদেশী বিনিয়োগ বাড়লেও তা সামগ্রিক পুঁজি চলে যাওয়ার ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজের ঊর্ধ্বতন গবেষক উল্লেখ করেন যে, জাতীয় নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পর বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিপুল আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। উল্টো, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি-আমদানি নির্ভর দেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের কাছে এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশের শেয়ারবাজারকে তাদের কাছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, আমাদের বাজারে সুশাসিত ও ভালো মানের কোম্পানির সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাধ্য হয়ে মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট শেয়ারে তাদের পুঁজি আটকে রাখেন। যখনই আন্তর্জাতিক কোনো কারণে মনোভাবের পরিবর্তন হয়, তখন এই অল্প কিছু শেয়ারে থাকা বিনিয়োগ দ্রুত ও ভারী বিক্রির চাপে পড়ে, যা স্থানীয় বাজার সহজে হজম করতে পারে না।

এছাড়া বাজারে তথাকথিত দুর্বল কোম্পানির আধিপত্য এবং দুর্বল করপোরেট গভর্নেন্সের অভাব পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপকদের প্রতিনিয়ত নিরুৎসাহিত করছে। স্বচ্ছতা, আর্থিক প্রতিবেদনের অসঙ্গতি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রক নজরদারির মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি আকর্ষণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। জটিল মূলধনী লাভ কর ব্যবস্থা এবং বিদেশ থেকে আনা তহবিল বা মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়ার চলমান জটিলতাও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল এখনও মিলছে না।

ডিএসই কর্মকর্তাদের মতে, সিটি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, বেক্সিমকো ফার্মা এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মতো শীর্ষ স্তরের কোম্পানিগুলো থেকে বিদেশীদের এই ধারাবাহিক শেয়ার বিক্রি ও পুঁজি প্রত্যাহার দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা, কারণ এর ফলে প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স-এর ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৬ এপ্রিল)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৬ এপ্রিল)

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে ফের কমেছে সোনার দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) নতুন করে দাম সমন্বয়ের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে প্রতি... বিস্তারিত