ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় ফান্ড নিয়ে টানাপোড়েন: মুখোমুখি বিএসইসি ও আইসিবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারের তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর সবচেয়ে পুরনো 'ইউনিট ফান্ড'-টির বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নেওয়ার জন্য জোরালো চাপ দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে বিএসইসি-র এই মারমুখী অবস্থানের মাঝেই, ১৯৮১ সালে তৎকালীন মন্ত্রিসভার অনুমোদিত দেশের প্রথম এই ওপেন-এন্ড (মেয়াদহীন) মিউচুয়াল ফান্ডটিকে নিবন্ধন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ ব্যাংক আইসিবি।
নথিপত্র অনুযায়ী, তৎকালীন মন্ত্রিসভার অনুমোদনে এবং আইসিবি অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ক্ষমতাবলে প্রণীত 'আইসিবি ইউনিট ফান্ড রেগুলেশনস, ১৯৮১' এর অধীনে এতদিন ধরে এই ফান্ডটি পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে বিএসইসি থেকে এটির কোনো আলাদা নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি চালুকৃত 'মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫' অনুযায়ী, বিএসইসি-র নিবন্ধন এবং লাইসেন্সধারী সম্পদ ব্যবস্থাপক (Asset Manager) ছাড়া কোনো ফান্ড পরিচালনা করা যাবে না। আর এই নতুন বিধিমালার আওতায় আইসিবি-র ফান্ডটিকেও নিবন্ধনের আওতায় আনতে চাইছে বিএসইসি।
গত ৯ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে আইসিবি এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চায়। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি আশঙ্কা করছে, ফান্ডটি নতুন নিয়মে নিবন্ধন করলে খরচ বৃদ্ধি, ইউনিট সারেন্ডার বা বিক্রির চাপ বাড়া, লভ্যাংশ কমে যাওয়া এবং ইউনিটহোল্ডারদের টাকা ফেরত দেওয়ার মতো নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর বিনিয়োগকারীরা যদি ঢালাওভাবে ইউনিট তুলে নিতে চান, তবে তাদের টাকা পরিশোধ করতে আইসিবি-কে শেয়ারবাজারে থাকা শেয়ার বিক্রি করে দিতে হবে, যা দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।
এর আগে গত মার্চ মাসে বিএসইসি এই ফান্ডটি নিবন্ধনের জন্য ৪৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। সেই সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না নেওয়ায়, গত ৫ মে বিএসইসি পুনরায় ৭ দিনের চূড়ান্ত আলটিমেটাম দিয়ে জানায়, নির্দিষ্ট সময়ে উদ্যোগ না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সময়সীমা গত ১২ মে শেষ হয়েছে।
তবে এর আগের দিন, ১১ মে বিএসইসি-কে দেওয়া এক চিঠিতে আইসিবি জানিয়েছে— ফান্ডটির নিবন্ধনের বিষয়টি সরকারের নীতিগত পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা বিএসইসি-র কাছে আরও কিছু সময় চেয়ে আবেদন করেছে।
নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে মাত্র ১৫.৮৪ কোটি টাকার মূলধন নিয়ে এই বিশেষায়িত জাতীয় বিনিয়োগ ও সঞ্চয় প্রকল্পটি যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে এই ফান্ডের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৯০৯ কোটি টাকা, যা এখন পর্যন্ত দেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় ফান্ড।
শুরু থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই ফান্ডটি মোট ৬,০৮৭.৫০ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড বিতরণ করেছে। ফান্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা পর্যন্ত প্রতি ইউনিটে ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছে এবং সাম্প্রতিক মন্দা বাজারের মধ্যেও প্রতি ইউনিটে ৩০ টাকা ডিভিডেন্ড দিয়েছে ফান্ডটি। আইসিবি জানিয়েছে, ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের এই ফান্ডের বর্তমান সারেন্ডার মূল্য (টাকা তুলে নেওয়ার রেট) ২৬৪ টাকা।
আইসিবি কর্মকর্তারা জানান, এই ফান্ডের অর্থ মূলত দেশের শীর্ষ লাভজনক কোম্পানি এবং সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। জনগণের আস্থা বাড়াতে সরকারও নীতিগত সহায়তা হিসেবে বহুজাতিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার এই ফান্ডের পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠির পর আইসিবি পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
আইসিবি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, এই ইউনিট ফান্ডটি মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি সঞ্চয়কারীদের বিনিয়োগে গঠিত একটি ট্রাস্ট ফান্ড। জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মতোই এটিকে একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল সঞ্চয় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে আইসিবি-র নিজস্ব কোনো সরাসরি বিনিয়োগ নেই।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই ফান্ডের অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই প্রবীণ নাগরিক, যারা এখান থেকে পাওয়া লভ্যাংশের ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করে ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন বা পরিচালন প্রক্রিয়া হস্তান্তর করা হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হতে পারে। এছাড়া নিবন্ধন এবং আলাদা ব্যবস্থাপনার কারণে খরচ বৃদ্ধি পেলে লভ্যাংশ কমে যাবে, যার ফলে মানুষ বিনিয়োগ তুলে নিতে বাধ্য হবে।
আইসিবি-র হিসাব মতে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই ফান্ডটির শেয়ারবাজারে ৪,৮০১.৬৫ কোটি টাকার শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে। যদি ইউনিট সারেন্ডারের চাপ সামলাতে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হয়, তবে তা বর্তমান ভঙ্গুর শেয়ারবাজারে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, বর্তমানে অনিবন্ধিত অবস্থায় ফান্ডটির বার্ষিক পরিচালন খরচ ৪১.২৪ কোটি টাকা। নতুন আইনের অধীনে এটি নিবন্ধিত হলে বার্ষিক খরচ প্রায় ৪৭% বেড়ে ৭৮ কোটি টাকায় পৌঁছাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ডের ওপর।
এমজে/
শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- মাস্টারদা সূর্য সেন হল অ্যালামনাইয়ের নতুন কমিটি ঘোষণা, সভাপতি ডাবলু, সাধারণ সম্পাদক পলাশ
- আফগান যুবাদের কাছে হারল বাংলাদেশের যুবারা
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাহমুদ আলমের মৃত্যু, উপাচার্যের শোক
- যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারিতে বাংলাদেশিরা কি অংশ নিতে পারবে? জানুন বিস্তারিত
- জেনে নিন আজকের বাজারে ২২,২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার দাম
- আজ ২২,২১ ও ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম কত? জেনে নিন
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৭ অক্টোবর)
- ১৫ দিনের ব্যবধান দুইবার হবে শারদীয় দুর্গাপূজা
- বৃহস্পতিবার রাজধানীর যেসব মার্কেট-দোকানপাট বন্ধ
- নতুন পে-স্কেলে শিক্ষকদের বেতন কবে, জানাল অর্থ মন্ত্রণালয়
- নভেম্বরে টানা তিন দিনের ছুটির সুযোগ, যারা পাবেন
- আজ ২২,২১ ও ১৮ ক্যারেট সোনার দাম কত? জেনে নিন
- ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা: ঢাবির সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার
- এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা ২৮ অক্টোবর থেকে, ফল প্রকাশ ১৫ নভেম্বর
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৪ অক্টোবর)