ঢাকা, সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২

আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র চলছে: গুতেরেস

২০২৬ জানুয়ারি ১৯ ১৯:২৮:০৬

আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র চলছে: গুতেরেস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বব্যবস্থায় শক্তির দাপট বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রভাবকে আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে এবং সেই ধারণা থেকেই দেশটি দায়মুক্তির সঙ্গে আচরণ করছে।

বিবিসি রেডিও ৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে একটি স্পষ্ট মনোভাব কাজ করছে—বহুপাক্ষিক সমাধান তাদের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ, যা অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড উপেক্ষা করেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক, পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির প্রেক্ষাপটে ইউরোপে অস্থিরতা বেড়েছে। এই বাস্তবতায় গুতেরেস মন্তব্য করেন, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলো—বিশেষ করে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমতার ধারণা—এখন হুমকির মুখে।

তিনি বলেন, এক পর্যায়ে তার উপলব্ধি হয়েছে যে, অনেক সংকটের সময় জাতিসংঘ প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর সমালোচনার প্রেক্ষিতে তিনি স্বীকার করেন, জাতিসংঘ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে কার্যকরভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না।

গুতেরেস জোর দিয়ে বলেন, বড় বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘ সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো, সংস্থাটির নিজস্ব কোনো বলপ্রয়োগের ক্ষমতা নেই; এই ক্ষমতা মূলত বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হাতেই কেন্দ্রীভূত।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই অতিরিক্ত প্রভাব কি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি কেবল তাৎক্ষণিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এই দুই ধরনের পদক্ষেপের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা পরিষদ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতাকে আর সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে না। ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে অনেক রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে, ফলে পরিষদ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে উঠছে।

তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা পরিষদে তিনটি ইউরোপীয় দেশ স্থায়ী সদস্য হিসেবে রয়েছে, যা বৈশ্বিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস ২০১৭ সালে জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব নেন এবং চলতি বছরের শেষেই তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

এর আগে সাধারণ পরিষদে দেওয়া বার্ষিক ভাষণে গুতেরেস বর্তমান বিশ্বকে ‘বিশৃঙ্খল’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, আজকের বিশ্ব সংঘাত, দায়মুক্তি, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ, আর আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট।

চলমান সংঘাতগুলোর মধ্যে গাজা পরিস্থিতিকে জাতিসংঘের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তার অভিযোগ, যুদ্ধের বড় একটি সময়ে গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে জাতিসংঘ বাধার মুখে পড়ে এবং ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি।

সম্প্রতি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন, ১৯৪৫ সালের সমাধান পদ্ধতি দিয়ে ২০২৬ সালের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিবর্তনের চেষ্টা, ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যাপক প্রাণহানি এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জ বাড়ছেই।

বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় বিশ্বনেতাদের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গুতেরেস। তবুও তিনি আশাবাদী থাকার কথা জানান।

তিনি বলেন, “শক্তিশালীদের চ্যালেঞ্জ করতে মানুষ প্রায়ই ভয় পায়। কিন্তু সত্য হলো, শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া একটি ন্যায্য ও ভালো বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”

সূত্র: বিবিসি

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত