ঢাকা, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
অস্তিত্ব বিলীন ফ্যামিলিটেক্সের কারখানা ও সব সম্পদ বিক্রি
অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের শেয়ারবাজারে এক সময়ের আলোচিত কোম্পানি ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেডের বাস্তব অস্তিত্বের চূড়ান্ত অবসান ঘটেছে। কোম্পানিটির পুরো কারখানা এবং সমস্ত সম্পদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) একটি বিশেষ তদন্ত দলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফ্যামিলিটেক্সের কারখানা প্রাঙ্গণ এবং করপোরেট প্রধান কার্যালয় এখন সম্পূর্ণ বন্ধ।
১৯ মে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ইতিমধ্যেই এই কারখানার মালিকানা 'বাংলাদেশ স্পিনার্স অ্যান্ড নিটার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করেছে। সিএসইর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই তথ্যের মাধ্যমে কোম্পানিটির হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো যে, তারা এখন এমন একটি কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখছেন যার অস্তিত্ব কেবল কাগজেই আছে, বাস্তবে কোনো সম্পদ নেই।
সিএসই তদন্ত দলের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলিটেক্সের উৎপাদন ও কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় কোম্পানিটি সম্পূর্ণ আর্থিক পতনের মুখে পড়ে। বেপজার সরকারি নথিপত্র থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (সিইপিজেড) অবস্থিত এই কোম্পানির সমস্ত সম্পদ একটি প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
বছরের পর বছর ধরে ইজারা চুক্তি লঙ্ঘন, সংবিধিবদ্ধ দায় এবং ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ফ্যামিলিটেক্সের বিরুদ্ধে এই চরম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কারখানাটি ২০৩৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হলেও বকেয়া আদায়ে বেপজা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই চুক্তিটি বাতিল করে। সিএসইর কর্মকর্তারা বলছেন, ভৌত অবকাঠামো চলে যাওয়ায় কোম্পানিটি এখন একটি ফাঁপা খোলসে পরিণত হয়েছে, যার ফলে জনসাধারণের কাছে থাকা শেয়ারগুলো কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।
বস্ত্র খাতের এই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে তহবিল উদ্ধারে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টার পর এই চূড়ান্ত অবসায়নের ঘটনা ঘটল। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে বেপজা প্রথমবার কারখানার ভবন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিলামের ঘোষণা দিয়েছিল। একইভাবে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও কোম্পানিটির কাছে থাকা ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে লড়াই করছে। ব্যাংকটি পূর্বে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোর্শেদের মালিকানাধীন চট্টগ্রামের তিনটি প্লট ও একটি ফ্ল্যাটসহ বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির জন্য নিলামের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সেই প্রচেষ্টাও সফল হয়নি এবং অর্থঋণ আদালতে ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটি এখনো ঝুলে রয়েছে।
শেয়ারবাজারে ফ্যামিলিটেক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে বেশ ধুমধামের সাথে। চড়া সুদের ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে কোম্পানিটি বাজার থেকে ৩৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। অভিষেকের বছরেই ১০০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছিল কোম্পানিটি। তবে সেই সুদিন বেশিদিন টেকেনি; ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে লোকসান দেখাতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে ফ্যামিলিটেক্সের স্বচ্ছতাও উধাও হয়ে যায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও গত পাঁচ বছর ধরে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা শেয়ারহোল্ডারদের কোনো আর্থিক ফলাফল বা করপোরেট তথ্য দেয়নি।
ফ্যামিলিটেক্স ট্র্যাজেডির সবচেয়ে ক্ষতিকারক দিকটি ছিল এর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ভূমিকা। তদন্তের রেকর্ড বলছে, প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুরুতে যথাযথ ঘোষণার মাধ্যমে দুই কোটি শেয়ার বিক্রি করলেও পরবর্তীতে পরিচালনা পর্ষদ কোনো নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ছাড়াই বাজারের প্রায় ১৫ টাকা দরে আরও ১১ কোটি শেয়ার ছেড়ে দেয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগেই একজন কোরিয়ান স্পন্সর এবং কোম্পানির তৎকালীন চেয়ারম্যান রোকসানা মোর্শেদসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে লাখ লাখ শেয়ার বিক্রি করে দেন। এর ফলে কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তাদের শেয়ারের অংশ কমে মাত্র ৪ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে এসেছে, আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়ে গেছে একটি বন্ধ কোম্পানির ৭৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ শেয়ার।
এই সংকট মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপগুলোও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে কোম্পানির বোর্ড পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেছিল। তবে পলাতক উদ্যোক্তারা কোনো সহযোগিতা না করায় এই পরিচালকেরা কখনোই কোম্পানির কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি। ম্যানেজমেন্টের শূন্যতা এবং কোম্পানির নথিপত্র দেখার সুযোগ না পেয়ে পরবর্তীতে স্বতন্ত্র পরিচালকেরা পদত্যাগ করেন। ফলে ফ্যামিলিটেক্সের সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ও সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন।
এমজে/
শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- চলছে বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান ম্যাচ: সরাসরি দেখুন এখানে
- পে স্কেল নিয়ে ৭ দাবি সরকারি কর্মচারীদের
- প্রথমবারের মতো নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য পেলো কুবি
- পে স্কেলের প্রস্তাবিত গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো প্রকাশ
- অনার্সে পড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিচ্ছে সরকার
- ঈদুল আজহার তারিখ নির্ধারণে বসছে চাঁদ দেখা কমিটি
- ডিগ্রি ৩য় বর্ষ পরীক্ষার ফরম পূরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
- সমকামিতার অভিযোগে দুই ছাত্রদল নেতাসহ ৪ শিক্ষার্থীর সিট বাতিল
- নতুন করপোরেট গভর্নেন্স রুলসের খসড়া প্রকাশ, মতামত আহ্বান বিএসইসির
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবাধিকার বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- না ফেরার দেশে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার
- বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সৌদি আরবে ফুল ফ্রি স্কলারশিপের সুযোগ
- নতুন উপাচার্য পেল দেশের ১০ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
- ৩৬,০০০ টাকা বেতনে চাকরির সুযোগ ইস্টার্ন ব্যাংকে
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (১৬ এপ্রিল)