ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
প্রবাসের ঠিকানা বদলায় শিকড়ের পরিচয় নয়
জে পি তালাস
লেখক
দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে নিউজিল্যান্ড। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শান্ত পরিবেশ, নিয়মতান্ত্রিক জীবন এবং নতুন সম্ভাবনার এই দেশে আজ অনেক বাংলাদেশির বসবাস। কেউ এসেছেন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে, কেউ কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে, আবার কেউ পরিবারের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করতে।
কিন্তু একটি দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আসা মানেই শুধু ঠিকানা পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে বদলে যায় জীবনের অনেক পরিচিত দৃশ্য। মায়ের রান্না, বাবার সঙ্গে গল্প, বন্ধুদের আড্ডা, পাড়ার পরিচিত মুখ, হঠাৎ কারও বাড়িতে চলে যাওয়া কিংবা সন্ধ্যার চায়ের আড্ডা সবকিছু একসময় স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
নিউজিল্যান্ডে এসে অনেক বাংলাদেশির প্রথম উপলব্ধি হয়, এখানে জীবন নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয়। পড়াশোনা, কাজ, বাসা, গাড়ি, বিল, কাগজপত্র এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে। দেশে যে কাজগুলো হয়তো পরিবার ভাগ করে নিত, প্রবাসে সেগুলোর অনেকটাই একা সামলাতে হয়।
বিশেষ করে নতুন যারা আসেন, তাদের জন্য প্রথম সময়টা সহজ নয়। নতুন পরিবেশ, ভিন্ন উচ্চারণের ইংরেজি, নতুন কর্মসংস্কৃতি এবং ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। কেউ হয়তো নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না, কেউ পড়াশোনার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় কাজ করেন, আবার কেউ নিজের পেশাগত অবস্থান তৈরি করতে নতুন করে শুরু করেন।
তবু প্রবাসীরা থেমে থাকেন না। কারণ, তাদের সঙ্গে থাকে একটি স্বপ্ন। কারও স্বপ্ন নিজের একটি বাড়ি, কারও স্বপ্ন ভালো একটি চাকরি, কেউ পরিবারের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ চান, কেউ চান মা-বাবাকে একদিন নিজের কাছে এনে রাখতে। আবার অনেক তরুণ চান, বিদেশে নিজের পরিচয় তৈরি করার পাশাপাশি দেশের জন্যও কিছু করতে। এই স্বপ্নই হয়তো প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বিশেষ দিক হলো, এখানকার মানুষ নিজেদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। বাংলা গান, কবিতা, বৈশাখী আয়োজন, ঈদ, পূজা, বাংলা মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সেই চেষ্টার প্রতিফলন দেখা যায়। বিদেশের মাটিতে যখন কেউ বাংলায় কথা বলেন, তখন ভাষাটা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে পরিচয়ের অংশ।
একটি বাংলা গান, এক প্লেট ফুচকা, এক কাপ চা কিংবা পরিচিত কোনো মিষ্টির স্বাদ হঠাৎ করেই মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের কোনো এক বিকেলে। আর এই জায়গাতেই প্রবাসী কমিউনিটির গুরুত্ব অনেক বেশি। নতুন কেউ নিউজিল্যান্ডে এলে একজন পরিচিত মানুষ যদি তাকে একটি চাকরির তথ্য দেন, বাসা খুঁজে দিতে সাহায্য করেন, প্রয়োজনীয় কোনো নিয়ম বুঝিয়ে দেন কিংবা শুধু বলেন, “কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবেন” এই ছোট্ট কথাটিও নতুন একজন মানুষের জন্য অনেক বড় আশ্বাস হয়ে দাঁড়ায়। প্রবাসে সবাই আত্মীয় নন, কিন্তু অনেক সময় একজন ভালো মানুষই হয়ে ওঠেন পরিবারের মতো।
তবে কমিউনিটির মধ্যেও আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। নতুন প্রজন্মকে শুধু বাংলা শেখানো নয়, তাদের বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গেও পরিচিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের সমাজের নিয়ম, মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্যকে সম্মান করে সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কারণ, বিদেশে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিশুর পরিচয় হয়তো দুই পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত। তার ঘর নিউজিল্যান্ডে, কিন্তু তার শিকড় বাংলাদেশে। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকা জরুরি নয়। বরং দুই সংস্কৃতির ভালো দিকগুলোকে ধারণ করেই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
প্রবাসজীবনের আরেকটি সত্য হলো একাকীত্ব। ব্যস্ত শহরে হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একজন মানুষ কখনো কখনো ভীষণ একা হয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে রাতের নীরবতায়, কাজ শেষে বাসায় ফিরে কিংবা দেশের কোনো প্রিয় মানুষের অসুস্থতার খবর শুনলে দূরত্বটা হঠাৎ অনেক বড় মনে হয়। তখন বোঝা যায়, উন্নত জীবন আর সুখী জীবন সব সময় একই অর্থ বহন করে না।
তবুও মানুষ এগিয়ে যায়। কারণ, পেছনে তাকালে হয়তো পরিবারের মুখ দেখা যায়, সামনে তাকালে দেখা যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। প্রবাসীদের জীবনকে তাই শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। একজন প্রবাসী কত টাকা আয় করেন, কী গাড়ি চালান বা কোথায় থাকেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি কতটা সংগ্রাম করে সেখানে পৌঁছেছেন।
নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আজ ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। কেউ ব্যবসা করছেন, কেউ পেশাজীবী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, আবার কেউ কমিউনিটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছেন। প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু তাদের সবার গল্পের কোথাও না কোথাও বাংলাদেশ আছে।
হয়তো তারা দেশের রাজপথে নেই, গ্রামের বাড়ির উঠানে নেই কিংবা পরিবারের প্রতিদিনের জীবনে নেই। কিন্তু দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি। বরং দূরত্ব কখনো কখনো ভালোবাসাকে আরও গভীর করে।
নিউজিল্যান্ডে বসে একজন বাংলাদেশি যখন নিজের সন্তানকে বাংলা শেখান, বাংলাদেশের গান শোনান, দেশের খাবার রান্না করেন কিংবা কোনো বাংলাদেশি অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তখন তিনি শুধু নিজের আনন্দের জন্য কিছু করছেন না; তিনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি শিকড় পৌঁছে দিচ্ছেন।
প্রবাসজীবন তাই শুধু বিদেশে থাকার নাম নয়। এটি নিজের পরিচয়কে নতুন বাস্তবতার মধ্যে ধরে রাখার লড়াই। এটি পরিবারের জন্য ত্যাগের গল্প। এটি নতুন সমাজে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প। এটি হাজার মাইল দূরে থেকেও দেশের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখার গল্প।
নিউজিল্যান্ড আমাদের নতুন জীবন দিয়েছে, নতুন সুযোগ দিয়েছে, নতুন পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু আমাদের শিকড় কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর বদলায়নি। কারণ, মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, তার হৃদয়ে একটি দেশ থেকে যায়। আমাদের জন্য সেই দেশ বাংলাদেশ। আর নিউজিল্যান্ডে বসে সেই বাংলাদেশকে হৃদয়ে ধারণ করেই আমরা এগিয়ে চলেছি, নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন স্বপ্ন নিয়ে।
লেখক: জে পি তালাস
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ৬৪ জেলায় পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগ, আবেদন ১৩ অক্টোবর
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৫ অক্টোবর)
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৫৩৮ পদে নিয়োগ, আবেদনের শেষ সময় ৬ অক্টোবর
- ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ
- মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, বাংলাদেশে দেখবেন যেভাবে
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটির সুযোগ
- আজকের নামাজের সময়সূচি (২ অক্টোবর)
- ব্রাজিল বনাম ভারত: সরাসরি দেখুন এখানে
- এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পে স্কেল নিয়ে যা জানা গেল
- শিশুশ্রম বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের
- ৯ গোল খেয়ে দুই ফুটবলারের ‘নারীসঙ্গ’ নিয়ে যা জানা গেল
- যে কারণে স্থগিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন্স ম্যাচ
- ‘রইদ’-এর ঝুলিতে তিন পুরস্কার, সেরা অভিনেত্রী নাজিফা তুষি
- এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে সুখবর দিলেন সেলিম ভূঁইয়া
- ১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল