ঢাকা, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ছবিতে সাফল্য আর বাস্তবে সংগ্রাম, প্রবাসজীবনের অদেখা গল্প
অনলাইন প্রতিনিধি: বিদেশ-শব্দটি শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দর শহর, দামি গাড়ি, বড় বড় ভবন, ভালো চাকরি, ঘোরাঘুরি আর উন্নত জীবন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত প্রবাসজীবনের এই সুন্দর ছবিটিই আমাদের চোখে পড়ে। কেউ নতুন গাড়ি কিনেছেন, কেউ সুন্দর বাসার ছবি দিয়েছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গেছেন, আবার কেউ লিখেছেন-‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রবাসজীবন।’ কিন্তু এই ছবির আড়ালে যে আরেকটি বাস্তব জীবন রয়েছে, সেই গল্পটি কতজন দেখি?
বিদেশে থাকা প্রতিটি মানুষের জীবন এক নয়। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পেশাজীবী। আবার কেউ রেস্টুরেন্ট, ফ্যাক্টরি, নির্মাণকাজ, ডেলিভারি কিংবা বিভিন্ন পেশায় কঠোর পরিশ্রম করে নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন। পেশা আলাদা হলেও অনেকের গল্পের জায়গাটি এক-নিজের মানুষদের ছেড়ে দূর দেশে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সংগ্রাম।
বিদেশে আসা অনেক শিক্ষার্থীর গল্প শুরু হয় একটি স্বপ্ন দিয়ে। ভালোভাবে পড়াশোনা করবেন, ভালো ক্যারিয়ার গড়বেন এবং একদিন নিজের ও পরিবারের জীবনকে আরও সুন্দর করবেন। কিন্তু নতুন দেশে পা রাখার পর শুরু হয় বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই। নতুন পরিবেশ, নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামলাতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ।
বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে নতুন আসা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম কয়েক মাস অনেক কঠিন হতে পারে। বিদেশে আসার আগে অনেকের ধারণা থাকে, পড়াশোনার পাশাপাশি সহজেই একটি চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে নতুন পরিবেশে এসে চাকরি খোঁজাটাও হয়ে ওঠে বড় একটি সংগ্রাম। একের পর এক জায়গায় আবেদন করা, ইন্টারভিউ দেওয়া, পরিচিতদের কাছে খোঁজ নেওয়া, সিভি দেওয়া এবং দিনের পর দিন অপেক্ষা করা-অনেকের ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া দুই-তিন মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
এর সঙ্গে থাকে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচের চাপ। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা, নতুন পরিবেশে একা হয়ে যাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক নতুন শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা ও মানসিক চাপ তৈরি করে। বাইরে থেকে হয়তো তাকে হাসতে দেখা যায়, নতুন দেশের ছবি দিতে দেখা যায়; কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে তখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য লড়াই করছে।
দিনে ক্লাস, হাতে চাকরির আবেদন, মাথায় ভবিষ্যতের চিন্তা-এভাবেই অনেক নতুন শিক্ষার্থীর প্রথম কয়েক মাস কেটে যায়। কেউ সকালে ক্লাস করে বিকেলে চাকরির জন্য বের হন, কেউ আবার সারাদিন চাকরির সন্ধানে ঘুরে রাতে ফিরে এসে অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করেন। অনেক সময় একটি চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই কঠিন সময়ই ধীরে ধীরে একজন মানুষকে বাস্তবতা বুঝতে শেখায়, শক্ত হতে শেখায় এবং নিজের জায়গা তৈরি করার সাহস দেয়।
একইভাবে চাকরিজীবী ও পেশাজীবীদের জীবনও বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। ভালো একটি চাকরি কিংবা পজিশনে থাকলেও রয়েছে কাজের চাপ, দায়িত্ব, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা এবং পরিবারের জন্য সময় বের করার সংগ্রাম। অনেক পেশাজীবীকে নতুন দেশে নিজের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আবারও নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।
আর শ্রমজীবী মানুষের গল্প তো আরও কঠিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শারীরিক পরিশ্রম এবং মাস শেষে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠানোর দায়িত্ব তাঁদের জীবনের নিয়মিত অংশ। রেস্টুরেন্ট, ফ্যাক্টরি, নির্মাণকাজ, ডেলিভারি কিংবা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের কাজে যুক্ত অনেক মানুষ দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অথচ তাঁদের সেই সংগ্রামের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব কমই দেখা যায়।
ব্যবসায়ীদের জীবনেও রয়েছে ভিন্ন ধরনের সংগ্রাম। ব্যবসা দাঁড় করানো, বিনিয়োগের ঝুঁকি, কর্মীদের দায়িত্ব, বাজার পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সবকিছু সামলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। কেউ শূন্য থেকে শুরু করেন, কেউ ছোট পরিসরে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। বাইরে থেকে শুধু সফলতাটাই দেখা যায়; কিন্তু সেই সফলতার পেছনে কত রাতের চিন্তা, কত দিনের পরিশ্রম, কত ঝুঁকি ও ত্যাগ রয়েছে, তা খুব কম মানুষই জানেন।
ফেসবুকে আমরা দেখি কয়েক সেকেন্ডের একটি ছবি। কিন্তু সেই ছবির পেছনে থাকতে পারে বছরের পর বছর পরিশ্রম। একটি নতুন গাড়ির পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। একটি সুন্দর বাসার পেছনে থাকতে পারে অসংখ্য কর্মঘণ্টা। একটি গ্র্যাজুয়েশনের ছবির পেছনে থাকতে পারে রাত জেগে পড়াশোনা, কাজের চাপ এবং পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্ট। একটি ভ্রমণের ছবির পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘ সময় পর পাওয়া সামান্য অবসর।
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতাগুলোর একটি হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। দেশে বাবা-মায়ের বয়স বাড়ছে, সন্তান বড় হচ্ছে, ভাই-বোনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসছে; কিন্তু প্রবাসী হয়তো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। কোনো এক রাতে ফোনের ওপাশ থেকে মা বললেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।’ আপনি হয়তো চাইলেও সঙ্গে সঙ্গে পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না। পরদিন আবার কাজে যেতে হলো। এই কষ্ট কোনো সুন্দর ফেসবুক ছবির ক্যাপশনে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তবে প্রবাসজীবন শুধু কষ্টের গল্পও নয়। বিদেশ অনেক মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিয়েছে। কেউ উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, কেউ ভালো চাকরি পেয়েছেন, কেউ ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, কেউ আবার কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করেছেন। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্নের ক্যারিয়ারে পৌঁছেছেন। অনেক শ্রমজীবী মানুষও বছরের পর বছর পরিশ্রম করে নিজের পরিবারকে স্বচ্ছল করেছেন।
তাই প্রবাসীদের শুধু তাঁদের গাড়ি, বাড়ি, পোশাক কিংবা ফেসবুকের ছবিতে বিচার করা উচিত নয়। একটি ছবির পেছনে থাকা মানুষটাকে বুঝতে হবে, তাঁর গল্পটা জানতে হবে। কারণ প্রবাস মানে শুধু বিদেশের সুন্দর শহর নয়; প্রবাস মানে স্বপ্ন, দায়িত্ব, পরিশ্রম, একাকিত্ব, ত্যাগ এবং অর্জনের সমন্বয়ে তৈরি একটি বাস্তব জীবন।
আমরা ফেসবুকে প্রবাসের সুন্দর ছবিটা দেখি, কিন্তু সেই ছবির পেছনের সংগ্রামটা দেখি না। অথচ প্রবাসের আসল গল্প ছবিতে নয়—আসল গল্প লেখা হয় মানুষের ঘাম, পরিশ্রম, ত্যাগ, স্বপ্ন আর নীরব সংগ্রামে। ফেসবুকে আমরা বিদেশ দেখি, আর প্রবাসীরা প্রতিদিন সেই বিদেশের বাস্তব জীবন বয়ে বেড়ান।
লেখক: জে পি তালাস, নিউজিল্যান্ড।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ১১তম মাসিক সভা অনুষ্ঠিত
- ১১-২০ গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় নতুন মানবণ্টন
- ঢাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সিরাজুল হক আর নেই
- নব্বইয়ের দশকের রেট্রো ছবি বানাবেন যেভাবে, জেনে নিন ১০ AI প্রম্পট
- পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সুখবর দিল মন্ত্রণালয়
- ‘সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিলটি কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক’
- ফেল বিরোধীদলের ওয়াকআউট
- ব্যালন ডি’অর ২০২৬-এর ৩০ ফুটবলারের তালিকা প্রকাশ
- মেঘনা গ্রুপে বিভিন্ন পদে চাকরির সুযোগ
- বক্তৃতায় দায় সারছে কমিশন, ধসের মুখে পড়েছে বাজার
- সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা ডিজিটাল ঋণ চালু করল বাংলাদেশ ব্যাংক
- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের ভাইভার তারিখ প্রকাশ
- ১১-২০ গ্রেডের চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ছে
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৭ সেপ্টেম্বর)
- নতুন পে-স্কেলে মোবাইল ভাতা পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা, কোন গ্রেডে কত?