×

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আন্দোলনে উত্তাল ভারত, চাপে কি মোদি সরকার?

২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১৯:২৪:৪৯

আন্দোলনে উত্তাল ভারত, চাপে কি মোদি সরকার?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) কার্যক্রমের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘ককরোচ’ আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। শুরুতে ছাত্র সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমিত থাকলেও এখন অভিনেতা, লেখক, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এতে সমর্থন দিচ্ছেন। এতে আন্দোলনের পরিসর বাড়ার পাশাপাশি দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপও বাড়ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির আয়োজনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতি আন্দোলনের বিস্তৃত জনসমর্থনের চিত্র তুলে ধরে। এতে অভিনেতা প্রকাশ রাজ, জনপ্রিয় ভিডিও নির্মাতা ধ্রুব রাঠীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় কর্মসূচি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচি ঘিরে ২২১ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য অংশ নেবেন। জম্মু ও কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে অতিরিক্ত বাহিনী আনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যও মোতায়েন করা হবে।

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আগে থেকেই জেড-প্লাস নিরাপত্তার আওতায় থাকলেও নতুন করে তাঁর বাসভবন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, এ ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অন্যান্য পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনটি আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকা ক্ষোভ নয়। এটি জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টির অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণের ফলে ভোটার তালিকায় অসংগতি তৈরি হয়েছে এবং এতে বহু মানুষের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বেঙ্গালুরুর সমাবেশে ধ্রুব রাঠী বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে অভিযোগ করেন, জীবিত ব্যক্তিদেরও মৃত বা অনুপস্থিত হিসেবে দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রকাশ রাজও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তাঁর মতে, পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সমাবেশ থেকে ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম বাতিলের দাবি আবারও জানান।

আন্দোলনকে ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতাও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা গত কয়েক দিন দিল্লির রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের আটক করেছে পুলিশ। বুধবার রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবারও রাজধানীর কিছু এলাকায় নতুন করে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। রাজঘাট এলাকায় সমাবেশ ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করেছে।

বিশিষ্ট লেখিকা অরুন্ধতী রায়ও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সম্প্রতি এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই আন্দোলন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘদিন নীরব থাকা অনেক মানুষ আবার প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন। তাঁর মতে, দেশে অসন্তোষ জমা হচ্ছে এবং সরকারও চাপ অনুভব করছে।

অরুন্ধতী রায়ের পাশাপাশি এর আগে শিক্ষাবিদ জয়তী ঘোষ, তনিকা সরকার, নিভেদিতা মেনন, অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ, চলচ্চিত্র নির্মাতা সঞ্জয় কাক, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও রত্না পাঠক শাহসহ অনেক বিশিষ্ট নাগরিক আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকও আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে পূর্ববর্তী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ অনশনেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদের নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে এবং আন্দোলনের সাফল্য তাঁদের আরও বড় দাবিতে সংগঠিত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা বা নিয়োগের মতো ইস্যুর তুলনায় ভোটার তালিকা ও ভোটাধিকার সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে তরুণ সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ একত্রিত হতে পারলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন আন্দোলনকারীদের অভিযোগ নাকচ করেছে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

এরপরও রাজনৈতিক মহলে আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্দোলন মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি, নির্বাচন কমিশনারের নিরাপত্তা বাড়ানো, বিরোধী নেতাদের আটক এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশে বিধিনিষেধ জারির মতো পদক্ষেপগুলো থেকে প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন মূল নজর ১০ অক্টোবরের যন্তর মন্তরের কর্মসূচির দিকে। সেদিন আন্দোলনকারীরা কতটা জনসমর্থন নিয়ে মাঠে নামতে পারেন এবং বিরোধী রাজনীতি, নাগরিক সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমর্থন কতটা বিস্তৃত হয়, তার ওপরই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ অনেকটা নির্ভর করবে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত