ঢাকা, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মাসিক নিয়ে কুসংস্কার নয়, দরকার স্বাস্থ্য সচেতনতা

পার্থ হক

রিপোর্টার

২০২৬ মে ২০ ১৮:৫৭:১৭

মাসিক নিয়ে কুসংস্কার নয়, দরকার স্বাস্থ্য সচেতনতা

পার্থ হক: মে মাসজুড়েই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় মাসিক সচেতনতা মাস। এরই অংশ হিসেবে প্রতি বছর ২৮ মে পালন করা হয় বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস। নারীদের মাসিক নিয়ে প্রচলিত লজ্জা, কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতেই এই দিবসের আয়োজন।

ঋতুস্রাব বা মাসিক নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এখনও সমাজে এটি নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের সংকোচ, গোপনীয়তা ও ভুল ধারণা। অনেকেই ‘মাসিক’ শব্দটি উচ্চারণ করতেও অস্বস্তি বোধ করেন। এর ফলে কিশোরী ও নারীরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যজ্ঞান থেকে বঞ্চিত হন এবং বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন।

প্রযুক্তি ও আধুনিকতার এই সময়ে এসেও মাসিক নিয়ে কুসংস্কার ও অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস সমাজে রয়ে গেছে। তাই মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ও সচেতনতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখন সময়ের দাবি।

মাসিক নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো মাসিকের সময় মেয়েরা ‘অপবিত্র’ থাকে। এ কারণে অনেক পরিবারে নারীদের রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না, ধর্মীয় কাজে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়, এমনকি আলাদা ঘরে থাকতে বলা হয়।

আসলে মাসিক কোনো অসুখ নয়। এটি নারীর প্রজননক্ষমতার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ। বয়ঃসন্ধিকালের পর প্রতি মাসে হরমোনের প্রভাবে জরায়ুর ভেতরে একটি স্তর তৈরি হয়। গর্ভধারণ না হলে সেই স্তর রক্তের সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে আসে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো, মাসিক চলাকালে গোসল করা উচিত নয়। অনেকে মনে করেন গোসল করলে রক্তক্ষরণ বাড়ে বা শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। বাস্তবে এ সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি। হালকা গরম পানিতে গোসল করলে শরীর সতেজ থাকে, ব্যথা কমে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে যায়।

একইভাবে টক খাবার, দুধ, মাছ বা ডিম খাওয়া যাবে না এমন ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এই সময়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া খুবই প্রয়োজন।

অনেক কিশোরী প্রথমবার মাসিক শুরু হলে ভয় পেয়ে যায়। কারণ আগে থেকে কেউ বিষয়টি নিয়ে তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন না। পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার অভাবে তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই মনে করে এটি কোনো রোগ। অথচ আগে থেকেই সঠিক তথ্য দেওয়া হলে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিষয়টি গ্রহণ করতে পারে।

স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারে সচেতনতা

অনেকে সুগন্ধিযুক্ত স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সুগন্ধিবিহীন প্যাড ব্যবহার করাই নিরাপদ। এতে যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক পিএইচ ভারসাম্য ঠিক থাকে এবং চুলকানি বা জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি কমে।

মাসিকের সময় পরিষ্কার ও নিরাপদ স্যানিটারি প্যাড, কাপড় বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা উচিত। কাপড় ব্যবহার করলে তা ভালোভাবে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে। অনেক নারী লজ্জার কারণে কাপড় অন্ধকার বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় শুকান, ফলে জীবাণু থেকে যায় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

একই প্যাড দীর্ঘসময় ব্যবহার করাও ক্ষতিকর। সাধারণত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা উচিত। দীর্ঘসময় একই প্যাড ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ, ফুসকুড়ি, চুলকানি ও সংক্রমণ হতে পারে। ব্যবহৃত প্যাড সঠিকভাবে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে, যাতে পরিবেশ দূষণ না হয়।

মানসিক যত্ন ও গুরুত্বপূর্ণ

মাসিকের সময় শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, মানসিক যত্নও প্রয়োজন। হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে এ সময় অনেকের মেজাজ খিটখিটে হতে পারে বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল আচরণ জরুরি।

‘এত রাগ করছ কেন, তোমার কি মাসিক চলছে?’ এমন বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ্রামাঞ্চলের অনেক স্কুলে এখনও পর্যাপ্ত টয়লেট ও স্যানিটারি ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক কিশোরী মাসিকের সময় স্কুলে যেতে চায় না, এমনকি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, সামাজিক ও শিক্ষাগত সমস্যাও।

স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, পরিষ্কার পানি ও স্যানিটারি ন্যাপকিনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও চিকিৎসকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে মাসিক সচেতনতা বাড়াতে।

মা-বাবার উচিত কন্যাসন্তানের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা এবং বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে আগেভাগেই আলোচনা করা। একই সঙ্গে ছেলেদেরও এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শেখে এবং নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করে।

‘পিরিয়ড পভার্টি’ নিয়েও ভাবতে হবে

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘পিরিয়ড পভার্টি’ বা মাসিক সামগ্রীর অভাব একটি বড় আলোচনার বিষয়। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক নারী নিরাপদ স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করতে পারেন না। বাংলাদেশেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

মাসিকের সময় যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে

প্রতিদিন অন্তত ১-২ বার পরিষ্কার পানি দিয়ে যৌনাঙ্গের বাইরের অংশ ধুতে হবে। অতিরিক্ত সাবান বা সুগন্ধিযুক্ত ওয়াশ ব্যবহার না করাই ভালো।

৪ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি একই প্যাড ব্যবহার করা উচিত নয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে আরও দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে।

পরিষ্কার ও শুকনো সুতি অন্তর্বাস ব্যবহার করা ভালো। ভেজা বা টাইট আন্ডারওয়্যার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

কাপড় ব্যবহার করলে তা সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুয়ে সরাসরি রোদে শুকাতে হবে।

প্যাড পরিবর্তনের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া জরুরি।

ব্যবহৃত প্যাড টয়লেটে ফ্লাশ না করে কাগজে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।

মাসিকের সময় পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ফল, শাকসবজি, ডিম, মাছ ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার শরীরের জন্য উপকারী।

শরীরের ক্লান্তি ও ব্যথা কমাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি আরাম দিতে পারে।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র ব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, চুলকানি বা জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এ সময় মেজাজের পরিবর্তন স্বাভাবিক। পরিবারের সহানুভূতি ও নিজের প্রতি যত্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একজন চিকিৎসক হিসেবে ডা. শারমিন আব্বাসি বলেন, মাসিক লজ্জার বিষয় নয়; এটি নারীর শক্তি ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকলে পরিবার ও সমাজও সুস্থ থাকবে। তাই মাসিক নিয়ে নীরবতা ভেঙে সচেতনতার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: ডা. ফারজানা ইসলাম রুপা (বিএমইউ), বই: নারীর সাস্থ্য,The Vagina Bible

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত