ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩

নিরাপদ মাতৃত্বে গর্ভধারণের আগে থেকেই যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

২০২৬ আগস্ট ২৮ ১৩:৪৩:২৭

নিরাপদ মাতৃত্বে গর্ভধারণের আগে থেকেই যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

ডুয়া ডেস্ক: একটি শিশুর পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে আলো দেখার আনন্দময় প্রক্রিয়ার পেছনে থাকে একজন নারীর দীর্ঘ ত্যাগ, শারীরিক রূপান্তর ও মানসিক লড়াই। মাতৃত্ব শুধু জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা নয়, এটি আগামী প্রজন্মের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশেরও অন্যতম ভিত্তি।

তবে সঠিক সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার কারণে এই আনন্দ অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি কিংবা জীবনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়। প্রসূতি মৃত্যুর হার কমাতে এবং মা ও শিশুকে নিরাপদ রাখতে গর্ভধারণের পূর্বমুহূর্ত থেকে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ তাঁর এক নিবন্ধে তুলে ধরেছেন, বিশ্বজুড়ে মাতৃত্বকালীন জটিলতায় অনেক নারীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী প্রথম ২৪ ঘণ্টা মা ও নবজাতকের জন্য সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময়।

প্রসবজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি বা এক্লাম্পসিয়া, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং তীব্র রক্তশূন্যতা মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া অনিরাপদ প্রসব এবং অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার মায়ের স্বাস্থ্যে নতুন জটিলতা তৈরি করছে।

গর্ভধারণের আগে পরীক্ষা ও পরিকল্পনা

সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের শুরুতেই রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে গর্ভধারণের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শে ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা দরকার।

নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা

পুরো গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। পাশাপাশি শিশুর অবস্থান, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি।

সুষম পুষ্টি ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম

গর্ভাবস্থায় খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার—যেমন দুধ ও ছোট মাছ—এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার রাখা প্রয়োজন। নিয়মিত আয়রন ও ক্যালসিয়ামের বড়িও গ্রহণ করতে হবে।

পাশাপাশি কায়িক পরিশ্রম বর্জন করে দিনে অন্তত দুই ঘণ্টা এবং রাতে আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন।

ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ

তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, হঠাৎ শরীর ফুলে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দেখা দিলে প্রসূতিকে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।

প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য

সন্তান জন্মের পর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রসবের পরবর্তী ছয় সপ্তাহ মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়।

প্রসবের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা, তৃতীয় দিন, সপ্তম দিন এবং ৪২তম দিনে বাধ্যতামূলকভাবে মায়ের শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে।

প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা

প্রসবের পর হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন ও ক্লান্তির কারণে অনেক মা তীব্র মানসিক অবসাদে ভোগেন। মায়ের বিষণ্নতা বা অতিরিক্ত কান্নাকে অবহেলা না করে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ক্ষতস্থান ও পুষ্টির যত্ন

সিজারিয়ান বা স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষতস্থান পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখতে হবে। বুকের দুধ উৎপাদনের জন্য প্রসূতিকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্যালরি ও তরল খাবার দেওয়া আবশ্যক।

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব

নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য পারিবারিক সহযোগিতা প্রধান শর্ত। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া থেকে শুরু করে প্রসব-পরবর্তী সময়ে শিশুর যত্ন—সব ক্ষেত্রেই স্বামীর সক্রিয় ও সহমর্মিতাপূর্ণ অংশগ্রহণ মায়ের মানসিক চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে।

একই সঙ্গে প্রসূতিকে ঘরের কাজের চাপ থেকে মুক্ত রাখা এবং প্রসব-পরবর্তী কুসংস্কার দূর করার মাধ্যমেই সুস্থ মা ও নবজাতকের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত