ঢাকা, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
টাকার বিনিময়ে ১২০০ শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন
নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরবর্তী সময়ে সচিবের দায়িত্ব পালন করা নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে ছেলের ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠার আগে ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর ফলাফলে অসংগতির তথ্য পেয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান এবং পটিয়া সরকারি কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বিভিন্ন অসংগতি সামনে আসে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি প্রায় ১ হাজার ২০০ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র ম্যানুয়ালি যাচাই করে। কয়েকজন পরীক্ষার্থীর বক্তব্যও নেওয়া হয়। তাদের কেউ কেউ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে পরবর্তীতে ফলাফল নিয়ে জটিলতার আশঙ্কায় পরীক্ষার্থী বা অভিভাবকেরা প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দিতে রাজি হননি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নম্বর পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে গড়ে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে ফলাফল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সন্তানদের ফল নিয়েও কারসাজির অভিযোগের কথা উঠে আসে।
পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী, উত্তরপত্রের নম্বর পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নারায়ণ চন্দ্র নাথের বক্তব্য জানতে ফোন ও এসএমএসে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে সামনে আসে ফলের অসংগতি
২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল ২০২২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হয়। সে সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক আবদুল আলীম এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন নারায়ণ চন্দ্র নাথ।
ফল প্রকাশের পর চেয়ারম্যান আবদুল আলীম ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অবস্থানকালে ফলাফলে বিভিন্ন অসংগতির তথ্য জানতে পারেন। পরে তিনি বিষয়টি তৎকালীন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে জানান। তার নির্দেশে চট্টগ্রামে ফিরে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন আবদুল আলীম। একই সঙ্গে অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হককে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
২০২২ সালের ৩ মার্চ চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফল প্রকাশের দিন সকালে পরীক্ষার্থীরা এক ধরনের নম্বর দেখতে পেলেও বিকেলে নম্বরের ফরম্যাট পরিবর্তিত হয়ে যায়। এতে উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বোর্ডে যোগাযোগ করলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সিসিটিভিতে দেখা যায় ফল প্রসেসিং কক্ষে কাজ
তদন্তের সময় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সিসিটিভি ফুটেজও পর্যালোচনা করে কমিটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত বোর্ডের প্রবেশপথের ক্যামেরার রেকর্ডিং বন্ধ ছিল।
তবে ১৩ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশের পর দুপুর ২টা ১১ মিনিটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও আইটি টিমের সদস্যদের ফল প্রসেসিং কক্ষে কম্পিউটারে কাজ করতে দেখা যায়। একই দিন রাত ৭টা ৫৯ মিনিটে শুধু আইটি টিমের সদস্যদের সেখানে কাজ করতে দেখা যায়। এসব কাজের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছিলেন, ফল প্রকাশের পর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিজে আইটি কক্ষে গিয়ে ফলাফল সংশোধনের কাজ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জানান, একজন পরীক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞানের ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় ২০৮ পেয়েছে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ২০ নম্বরের পরীক্ষায় ওই পরীক্ষার্থীকে ২৮ নম্বর দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের আরও কিছু ভুল সংশোধন করা হয়।
অন্যদিকে নারায়ণ চন্দ্র নাথ তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া বক্তব্যে জানান, ফল প্রকাশের পর তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন। তাই পরীক্ষার্থীদের নম্বর পরিবর্তন বা ফলাফলের অসংগতি সংশোধনের জন্য কারও কাছ থেকে অনুমতি কিংবা নির্দেশনা নেননি।
তদন্তে বাধা ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
তদন্ত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক দাবি করেন, তদন্ত চলাকালে তিনি হুমকি ও নানা ধরনের চাপের মুখে পড়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত বন্ধের জন্য নারায়ণ চন্দ্র নাথ হাইকোর্টে রিট করেছিলেন, তবে তা খারিজ হয়ে যায়। এরপর তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হুমকি দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলীমও ফলাফল নিয়ে অনিয়মের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার দাবি, এসব ঘটনায় বোর্ডের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ২০২২ সালের ২৫ জুলাই বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানান, দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে ফলের অসংগতির মূল দায় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ওপর দেওয়া হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে শোকজ করে। তবে অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ছয় মাসের মধ্যে তাকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিবের দায়িত্বও পালন করেন।
এরপর নিজের ছেলের ফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ
২০২৩ সালে নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ছেলে পরীক্ষায় টেনেটুনে পাস করলেও পরে রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক মিলিয়ে ১৪টি উত্তরপত্রে ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে তাকে এ প্লাস পাইয়ে দেওয়া হয়।
শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নক্ষত্রের ফল নিয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা হলে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। এ ঘটনায় নারায়ণের স্ত্রী বনশ্রী দেবনাথ পাঁচলাইশ থানায় পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে নারায়ণ চন্দ্র নাথকে শিক্ষা বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাকে মাউশির চট্টগ্রামের পরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মামলা ও অভিযোগপত্র
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণ চন্দ্র নাথকে জালিয়াতির অভিযোগে ওএসডি করা হয় এবং নক্ষত্র দেবনাথের ফল বাতিল করা হয়।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ পাঁচলাইশ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ১৭ জুন আদালতে আত্মসমর্পণের পর নারায়ণ চন্দ্রকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৮ আগস্ট নারায়ণ চন্দ্র নাথ, তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মামলার অপর দুই আসামি হলেন সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান ও সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ২০২১ সালের ফল নিয়ে করা তদন্ত এবং পরবর্তী সময়ে ছেলের ফল পরিবর্তনের অভিযোগ দুই ঘটনাই এখন নারায়ণ চন্দ্র নাথকে ঘিরে ওঠা গুরুতর অনিয়মের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণের নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত
- পর্নোগ্রাফি মামলায় ইনফ্লুয়েন্সার সুমাইয়া গ্রেফতার
- লন্ডনে ঢাবি অ্যালামনাই ইউকের কোচ ট্রিপ অনুষ্ঠিত
- ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে মাইগ্রেশনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ জয়ী
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)
- স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক নিয়োগ, আবেদন ১৮ আগস্ট পর্যন্ত
- বিইউপিতে ২৯ পদে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ
- খণ্ডকালীন শিক্ষক নেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জানুন আবেদনপদ্ধতি
- নতুন পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন, যেভাবে বাস্তবায়ন হবে বেতন-ভাতা
- নবম পে স্কেল নিয়ে যা জানা গেল
- বস্ত্র অধিদপ্তরে ৪২ পদে পুনর্নিয়োগ
- চালুর প্রথম দিনেই দুর্ঘটনায় পিংক বাস
- নোবিপ্রবির ১৭ শিক্ষকের বেতন বন্ধ
- দিনে তিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট দেখার নির্দেশ
- নারীদের চোখে পুরুষের যে ৫ শখ বেশি আকর্ষণীয়