ঢাকা, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩

‌‘কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে’

২০২৬ আগস্ট ২২ ১৯:৪৪:৫৬

‌‘কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে’

নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ সাফল্যের পেছনে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলকে কৃতিত্ব দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে, তখনই অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকে। তবে ভালো খবর হলো, অতীতের মতো এবারও কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েও অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে সরকার।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: রাজস্ব ও মুদ্রানীতির প্রেক্ষিত এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ স্বাগত বক্তব্য দেন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সীমিন রহমান, বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. একে এনামুল হক এবং সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি অর্জন বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক দর্শনও একই—বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে, আর সরকার সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ছাড়া বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। দেশের ভেতরে বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না।

তিনি জানান, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান অনেক বাধা দীর্ঘদিনের এবং সেগুলো রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং একটি ওয়েবসাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে ব্যবসায়ীরা সরাসরি সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।

আমির খসরু আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে এবং আমদানি ছাড় দ্রুত করতে কাস্টমস ও বন্দর কার্যক্রমে সময়সীমাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতি ছিল। দুই বা ততোধিক ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং গ্যাসের মজুদ বাড়ানোর কাজও এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় জ্বালানির মজুদ ছিল মাত্র ১৫–১৭ দিনের, যা এখন প্রায় এক মাসে উন্নীত হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য তিন মাসের সমপরিমাণ মজুদ গড়ে তোলা।

ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল, গ্রেস পিরিয়ড এবং ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগসহ একটি সহায়তা প্যাকেজ চালু করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ চালু করা হয়েছে এবং ঋণ বিতরণে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বরদাশত করা হবে না।

আমির খসরু বলেন, কারুশিল্প, কুটিরশিল্প, ক্রীড়া, বিনোদন, নাটক, সংগীতসহ সৃজনশীল খাতগুলোকে মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার কাজ করছে। এসব খাতে ঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা, ব্র্যান্ডিং, বিপণন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।

তিনি বলেন, সরকারের কল্যাণমূলক কর্মসূচি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক সহায়তার জন্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কর ও বন্দর ব্যবস্থায় অটোমেশন জোরদার করে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিকল্প অর্থায়নের বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ বলেন, সরকার পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করতে কাজ করছে। পাশাপাশি ডলার, বন্ড ইস্যুসহ নতুন অর্থায়ন পদ্ধতি চালুর প্রস্তুতিও চলছে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপ কমে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎই বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণযোগ্য জ্বালানির উৎস। একই সঙ্গে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো যায়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

সেমিনার আয়োজনের জন্য ডিসিসিআইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সংলাপ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে এমন অনেক বিষয় সামনে আসে, যা অন্যথায় সরকারি ব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতে পারে।

আমির খসরু বলেন, অর্থমন্ত্রী বা সরকার একা কিছু করতে পারে না। অংশীদারিত্ব ও দলগত কাজ ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত