×

ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

কেন একজনকে হাই তুলতে দেখলেই আপনারও হাই ওঠে?

২০২৬ জুলাই ২৮ ১২:৪০:০০

কেন একজনকে হাই তুলতে দেখলেই আপনারও হাই ওঠে?

ডুয়া ডেস্ক: হাই তোলা মানুষের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া। ঘুম, ক্লান্তি কিংবা অলসতা অনুভব করলে অনেকেই হাই তোলেন। তবে কৌতূহলের বিষয় হলো, অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলেও অনেক সময় নিজের অজান্তেই হাই চলে আসে। এমনকি ‘হাই তোলা’ শব্দটি শুনলেও অনেকের একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেন এমন ঘটে-সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

ধরা যাক, অফিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা চলছে। হঠাৎ পাশের সহকর্মী বড় করে হাই তুললেন। মুহূর্তের মধ্যেই আপনারও চোখ ভারী হয়ে আসে, মুখ খুলে যায় এবং অজান্তেই আপনিও একটি দীর্ঘ হাই তুলে ফেলেন। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ‘মিরর নিউরন’। মস্তিষ্কের এই বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষ অন্যের আচরণ, অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি অনুকরণ করতে সাহায্য করে। অন্যকে দেখে শেখা, তার অনুভূতি বোঝা কিংবা সহানুভূতি প্রকাশের মতো বিভিন্ন কাজেও এই নিউরন সক্রিয় থাকে। হাই তোলার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া কাজ করে।

অনেকের ধারণা, শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হলে হাই ওঠে। তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এ ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাদের মতে, রক্তে অক্সিজেন বা কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রার সঙ্গে হাই তোলার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় কাজ, চিন্তা বা মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্ক উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে। হাই তোলার সময় মুখ দিয়ে প্রবেশ করা শীতল বাতাস এবং মুখমণ্ডলের পেশির নড়াচড়া মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সহায়তা করে। ফলে মস্তিষ্ক কিছুটা শীতল হয়। এ কারণেই অনেক গবেষক হাইকে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ‘কুলিং প্রসেস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-হাই যদি মস্তিষ্ককে শীতল করার প্রক্রিয়া হয়, তাহলে অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলেই নিজের কেন হাই ওঠে?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে কাজ করে ‘ক্যামেলিয়ন এফেক্ট’। এটি মানুষের এমন এক অবচেতন প্রবণতা, যার মাধ্যমে মানুষ অজান্তেই আশপাশের মানুষের অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও আচরণ অনুকরণ করে। শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাই অন্য কাউকে হাই তুলতে দেখলে মস্তিষ্কও একই আচরণ অনুসরণ করার সংকেত দেয়।

গবেষকদের মতে, এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘এমপ্যাথি’ বা সহমর্মিতারও সম্পর্ক রয়েছে। অন্যের অনুভূতি উপলব্ধি করার মানসিক ক্ষমতা যত বেশি, অন্যকে হাই তুলতে দেখে নিজেরও হাই ওঠার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। এমন প্রতিক্রিয়া কুকুর ও বিড়ালের মতো পোষা প্রাণীর মধ্যেও দেখা গেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্নমত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার বা স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অন্যকে হাই তুলতে দেখে একই প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। কারণ এসব অবস্থায় সামাজিক সহমর্মিতা ও আবেগগত প্রতিক্রিয়ার ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, হাই তোলা শুধু ক্লান্তি বা ঘুমের লক্ষণ নয়। এটি মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, স্নায়বিক অনুকরণ এবং মানুষের সামাজিক ও আবেগগত সংযোগ-এই তিনটির সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত