×

ঢাকা, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশকে শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে: প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ অক্টোবর ০৩ ১২:২৪:২৫

বাংলাদেশকে শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের অভাবনীয় ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশ নতুন একটি সরকার পেয়েছে। সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের লক্ষ্য করেই এসব কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কৃষকদের প্রণোদনা, প্রয়োজনীয় সেবা ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করবে ফারমার্স কার্ড। হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি করা হবে। আর ইউনিভার্সাল কার্ড সরকারি সেবায় সমন্বিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজ চলছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শ এবং প্রয়োজন হলে রেফারেল সেবা দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা শুধু শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা তাঁদের জীবন মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করবে। পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, নৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শ যুক্ত করা হবে। শিক্ষার্থীদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হবে এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পরিধি বাড়ানো হবে। প্রথম শ্রেণি থেকেই সরকার বিনামূল্যে পোশাক, স্কুলব্যাগ, দুপুরের খাবার ও উপবৃত্তি দেবে। মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের বিশাল সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজন। সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির পরিবর্তন গ্রহণ করছে। পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মেধা পাচারকে মেধার পুনঃব্যবহারে রূপান্তর করাই তাঁর লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

কৃষিকে অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, অর্থায়ন এবং বাজারে কৃষকের প্রবেশাধিকার সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মৎস্য, গবাদিপশু ও গ্রামীণ উদ্যোগেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি মানেই একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও পানিপথ পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ কৃষিতে সহায়তার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়াবে।

পরিবেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইনশাআল্লাহ আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ করা হবে। সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও সবুজ কারখানাকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি ‘লিড সার্টিফায়েড’ কারখানার মধ্যে ৫৩টিই বাংলাদেশে।

মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাকস্বাধীনতা রক্ষাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তাঁদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। এ জন্য টেকসই রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রয়োজন। সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও সেখানেই হতে হবে বলে জানান তিনি।

বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখে আসছে। কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশের বন্দর, পানিপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতি বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। শিপিং, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। এ জন্য সমতা, ন্যায্যতা ও সুবিচারের ভিত্তিতে গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশ আলোচনা, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রেখেই সব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করা হবে। শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে এমন একটি অঞ্চলে পরিণত করার আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে দেশগুলো একসঙ্গে এগিয়ে যাবে এবং পারস্পরিক সুবিধা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের ভূমিকা পালনে পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী এবং সংস্থাটির সভাপতি ও বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান।

‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস : নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) শুরু হওয়া এই আন্তর্জাতিক সংলাপ চলবে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নিচ্ছেন।

সংলাপের বিভিন্ন অধিবেশনে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক রূপান্তর, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত