ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

এক সময়ের ব্লু-চিপ কোম্পানি, এখন গভীর সংকটে

২০২৬ জুলাই ০৯ ১৬:১২:৩০

এক সময়ের ব্লু-চিপ কোম্পানি, এখন গভীর সংকটে

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় দেশের ইলেকট্রনিকস ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত সিঙ্গার বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে। ২০১২ সালে ৬৭০ কোটি টাকা বিক্রির বিপরীতে ৪৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করা কোম্পানিটি ১৩ বছর পর ২০২৫ সালে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করেও ২২৫ কোটি টাকা নিট লোকসানে পড়েছে। চলতি বছরেও সেই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।

টানা লোকসানের কারণে ২০২৫ সালের আয়ের বিপরীতে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি কোম্পানিটি। একই সঙ্গে সঞ্চিত লোকসান পরিশোধিত মূলধন ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমিত করেছে।

কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিক্রি বাড়লেও ঋণের সুদের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন মুনাফা পুরোপুরি খেয়ে ফেলেছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধি সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের নিট লোকসানে পড়েছে।

তুরস্কভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আর্চেলিকের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ডিএসইতে তালিকাভুক্ত সিঙ্গার বাংলাদেশ ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী ২২৫ কোটি টাকা নিট লোকসানের হিসাব প্রকাশ করেছে। আগের বছর কোম্পানিটির লোকসান ছিল ৫০ কোটি টাকারও কম। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে ঋণাত্মক ২২ টাকা ৫৬ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ঋণাত্মক ৪ টাকা ৯১ পয়সা।

২০২৫ সালে কোম্পানিটির বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১৪.৩০ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। নতুন উৎপাদন কারখানায় উৎপাদন শুরু হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে। মোট (গ্রস) মুনাফাও ৪৭১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫১৬ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল ধরে রাখতে পারেনি কোম্পানিটি। বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আর্থিক ব্যয় এক লাফে ১৪৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অথচ একই সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল মাত্র ৫৫ কোটি টাকা। ফলে ঋণের সুদের চাপ কোম্পানির মুনাফাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলধনী বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় সিঙ্গার তারল্য সংকটে পড়ে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক ওভারড্রাফটসহ সুরক্ষিত স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণসুবিধা ব্যবহার করছে কোম্পানিটি। এর মধ্যে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন থেকে ৩০৫ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক থেকে ২৪৯ কোটি টাকা (এর মধ্যে ৯৯ কোটি টাকা ওভারড্রাফট), ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭৭ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

ঋণ ও লিজের সুদ বাবদ বছরজুড়ে নগদ ২৬৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে কোম্পানিটিকে। ফলে ব্যাংক ওভারড্রাফট সমন্বয়ের পর বছর শেষে নগদ অর্থের অবস্থান ঋণাত্মক ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকায় নেমে আসে।

তবে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) ঋণাত্মক ৭ টাকা ৯৬ পয়সা থেকে বেড়ে ইতিবাচক ১৪ টাকা ৫৬ পয়সায় উন্নীত হয়েছে, যা মূলত বিক্রির অর্থ আদায় বাড়ার ফল।

বার্ষিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটি জানায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কাঁচামালের বাড়তি দামের কারণে বিক্রি বাড়লেও মোট মুনাফার প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রস মার্জিন ২৭ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎপাদন ব্যয়ের পুরো চাপ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কোম্পানির দাবি, শিল্পের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের গ্রস মার্জিন এখনও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

ডিভিডেন্ড না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ জানিয়েছে, বছরের বড় অঙ্কের নিট লোকসান এবং মূলধনী বিনিয়োগের কারণে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের জন্য কোনো ডিভিডেন্ড প্রস্তাব করা হয়নি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সিঙ্গার বাংলাদেশ জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদে চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন উৎপাদন কারখানা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমবে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়বে, পণ্যের মান উন্নত হবে এবং মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের চাহিদা আরও ভালোভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএলের মতো স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেও সিঙ্গারের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ওয়ালটনের এক কর্মকর্তার দাবি, বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটর বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ তাদের দখলে, যেখানে একসময় সিঙ্গার ছিল অন্যতম শীর্ষ ব্র্যান্ড। অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএলও নতুন নতুন বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে দ্রুত অবস্থান শক্তিশালী করছে।

প্রথম প্রান্তিকেও লোকসান বেড়েছে

২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও সিঙ্গারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। কোম্পানির ডিএসইতে জমা দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে মোট বিক্রি ৫৫৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৭৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে পুরোপুরি রপ্তানি আয় থেকে। দেশীয় বাজারে বিক্রি সামান্য কমে ৫৫৮ কোটি টাকা থেকে ৫৫৫ কোটি টাকায় নেমেছে। বিপরীতে রপ্তানি আয় প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ২১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

তবে বিক্রি বাড়লেও পরিচালন মুনাফা ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা থেকে কমে ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নেমেছে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ১১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় চাপ এসেছে ঋণের সুদের ব্যয় থেকে। নিট আর্থিক ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ৪৭ কোটি টাকা থেকে ৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আর মোট আর্থিক ব্যয় ৭২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এর ফলে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটির নিট লোকসান বেড়ে প্রায় ৫৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসানও ৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৬০ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।

ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমে যায়। ডিএসইতে ফল প্রকাশের পরদিন সিঙ্গারের শেয়ারে কার্যত কোনো ক্রেতা দেখা যায়নি, যা কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগেরই প্রতিফলন।

এএসএম/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত