ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জেনে নিন সমাবর্তন টুপির অজানা ইতিহাস

ইনজামামুল হক পার্থ
ইনজামামুল হক পার্থ

রিপোর্টার

২০২৬ জুন ১১ ১৯:৩৫:০৪

জেনে নিন সমাবর্তন টুপির অজানা ইতিহাস

পার্থ হক: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠান বা সমাবর্তন শিক্ষার্থীদের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত। এই অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে তাঁদের গ্র্যাজুয়েশন টুপি আকাশে ছুড়ে দিয়ে আনন্দ উদযাপন করেন। তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।

অনুষ্ঠানে যখন ঘোষণা করা হয় ‘আপনারা এখন গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক’, তখন শিক্ষার্থীদের টুপির ঝুলন্ত ফিতা বা ট্যাসেলটি ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এই ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থীর ডিগ্রি অর্জন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বিশেষ ওই টুপি মাথায় নিয়েই পরিবারের সামনে আসেন, যা তাঁদের জীবনের অন্যতম আবেগঘন ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে। সমাবর্তনে ব্যবহৃত এই টুপিকে বলা হয় মর্টারবোর্ড ক্যাপ, যার ওপরের অংশ সমতল হওয়ায় এটি সহজেই দূর থেকে চিহ্নিত করা যায়।

মর্টারবোর্ড ক্যাপের ইতিহাস শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালিতে। তখন ‘বাইরেটা’ নামের ক্যাথলিক যাজকদের একটি বিশেষ টুপি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নকশা তৈরি করা হয়। চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই গির্জার যাজক ও প্রভাবশালী পণ্ডিতরা বাইরেটা টুপি ব্যবহার করতেন।

প্রথমদিকে মর্টারবোর্ড ক্যাপ আজকের মতো চারকোনা ছিল না। তখন এর ওপরের অংশে তিনটি উঁচু আকৃতি এবং মাঝখানে একগুচ্ছ সুতা যুক্ত থাকত।

১৬৬০ সালের দিকে এটি বর্তমান চারকোনা রূপ নিতে শুরু করে, যখন ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইতিহাসবিদ স্টিফেন ওলগাস্টের মতে, নতুন রাজার প্রতি আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে যাজক ও পণ্ডিতরা তাঁদের টুপির ওপরের অংশ বড় করতে শুরু করেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টুপির এই বড় অংশটি সোজা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সেটিকে সমতল ও স্থিতিশীল রাখতে ভেতরে শক্ত কাঠামো যোগ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে আধুনিক চারকোনা গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপের প্রচলন শুরু হয়।

‘মর্টারবোর্ড’ নামটির উৎপত্তিও এসেছে এর আকৃতি থেকে। এই টুপি দেখতে অনেকটা নির্মাণশ্রমিকদের ব্যবহৃত মর্টার বহনের জন্য ব্যবহৃত বর্গাকার কাঠের তক্তার মতো। এই সাদৃশ্যের কারণেই নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নির্মাণশ্রমিকদের ব্যবহৃত আসল মর্টারবোর্ড মূলত একটি সমতল কাঠের তক্তা। গ্র্যাজুয়েশন টুপির ওপরের অংশও ঠিক একই ধরনের দেখতে হওয়ায় ১৯ শতকের মাঝামাঝি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এটিকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন।

পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরাই এই টুপির নাম দেন ‘মর্টারবোর্ড’, যা ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। যদিও এর নামকরণ নিয়ে কিছু ভিন্ন মত রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই টুপি উচ্চশিক্ষার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সপ্তদশ শতকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য টুপি ও গাউন পরা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন সাধারণ স্নাতকদের জন্য ভিন্ন ধরনের টুপি থাকলেও উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাই কেবল চারকোনা টুপি পরার সুযোগ পেতেন।

১৬৭৫ সালের পর ধনী পরিবারের সাধারণ স্নাতকদেরও এই টুপি পরার অনুমতি দেওয়া হয়, ফলে এটি ধীরে ধীরে মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়।

সপ্তদশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হলে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের শিক্ষা কাঠামো অনুসরণ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গ্র্যাজুয়েশন পোশাক ও টুপির ব্যবহার নতুন মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রথা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়। প্রায় এক শতাব্দী আগে সেখানে সমাবর্তন শেষে ট্যাসেল ডান দিক থেকে বাঁ দিকে সরানোর নিয়ম প্রচলিত হয়, যা আজও অনুসরণ করা হয়।

যদিও ট্যাসেলের অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট লিখিত নিয়ম নেই, তবুও এই ঐতিহ্য এখন বিশ্বের বহু দেশ, এমনকি বাংলাদেশেও সমানভাবে অনুসরণ করা হয় এবং তা সমাবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত