ঢাকা, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩

৭ হাজার বিনিয়োগকারীর টাকা আটকে, এক বছরেও ফেরত নেই

২০২৬ এপ্রিল ২২ ১৪:২৫:৩২

৭ হাজার বিনিয়োগকারীর টাকা আটকে, এক বছরেও ফেরত নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রায় এক বছর পার হলেও মশিউর সিকিউরিটিজ লিমিটেডের অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা এখনো তাদের অর্থ ফেরত পাননি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করলেও অর্থ উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রোকারেজ হাউজটির ৭ হাজারের বেশি গ্রাহকের একজনও এখন পর্যন্ত একটি টাকাও ফেরত পাননি। ফলে দেশের শেয়ারবাজারে আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকের দাবি, মশিউর সিকিউরিটিজ এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদ অনুসন্ধানে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির এক পরিচালক জানান, “আমরা প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি।” তবে মামলার পরবর্তী তদন্ত এখনো চলমান থাকায় বিস্তারিত কিছু জানানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে, অর্থ ফেরতের আশায় ভুক্তভোগীরা শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসই এবং দুদকের দ্বারস্থ হলেও কোনো সুফল পাননি। হতাশ বিনিয়োগকারীরা ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামে (সিএমজেএফ) সংবাদ সম্মেলন করে দ্রুত অর্থ ফেরত এবং দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দীর্ঘসূত্রিতা শেয়ারবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। তারা বলেন, “প্রতারণা শনাক্ত হলেও প্রয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যাচাই শেষে অর্থ উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা কাজ করছে না।”

গত বছরের এপ্রিল মাসে বিএসইসি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মশিউর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদককে অনুরোধ জানায়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যা দেশের শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মধ্যে সমন্বিত গ্রাহক হিসাব (সিসিএ) থেকে প্রায় ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং গ্রাহকদের শেয়ার অননুমোদিতভাবে বিক্রি করে প্রায় ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের একজন জানান, প্রতারণার মাধ্যমে তার সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে গেছে। তিনি ২০০০ সালের শুরুর দিকে একটি বিও হিসাব খুলে ধীরে ধীরে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের মতো ভালো মানের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। “আমি নিয়মিত লেনদেন করতাম না, বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয়ের মতো করে বিনিয়োগ করেছিলাম,” বলেন তিনি।

তিনি অভিযোগ করেন, তার শেয়ার বিক্রির পর কোনো এসএমএস বা ই-মেইল পাননি। পরে জানতে পারেন, সফটওয়্যারের মাধ্যমে নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা হয়েছিল। “ডিভিডেন্ড পেতাম, তবে ফোন করলে দিত। এতে মনে হতো সব ঠিক আছে,” যোগ করেন তিনি।

২০২৫ সালে হিসাব স্থানান্তরের চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি প্রথম প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারেন। যদিও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটি তখনও তার হিসাব বিবরণীতে শেয়ার দেখাচ্ছিল।

ডিএসই তদন্তে পরে জানায়, শেয়ারগুলো অনেক আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া বিবরণী দিয়ে শেয়ার থাকার তথ্য দেখাচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ডিএসই পরিদর্শনে প্রথম অনিয়ম ধরা পড়ে। পরবর্তীতে বিএসইসি, ডিএসই ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি গভীর জালিয়াতির প্রমাণ পায়।

তদন্তে উঠে আসে, ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভুয়া পোর্টফোলিও তৈরি, গ্রাহকদের কাছে মিথ্যা রিপোর্ট পাঠানো, ফোন নম্বর পরিবর্তন করে সিডিবিএলের বার্তা আটকে দেওয়া এবং লেনদেন সংক্রান্ত নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার মতো কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।

সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ধীরগতির কারণে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশিউর সিকিউরিটিজ কেলেঙ্কারি দেশের শেয়ারবাজারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এতে দেখা গেছে, এমনকি ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগকারী—যারা ভালো কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেন—তারাও প্রতারণার শিকার হতে পারেন।

এএসএম/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত