ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩

নিরীক্ষকের আপত্তিতে চাপে স্বল্প মূলধনী কোম্পানি

২০২৬ এপ্রিল ১৭ ১৫:০১:৪৪

নিরীক্ষকের আপত্তিতে চাপে স্বল্প মূলধনী কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের স্বল্প মূলধনী কোম্পানি মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ডিভিডেন্ড ও সম্পদ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। এই বিষয়টি সামনে আসতেই সক্রিয় হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বকেয়া ডিভিডেন্ড এবং স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার সংক্রান্ত নিরীক্ষকের মন্তব্য নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসব অনিয়মের পেছনে কারা দায়ী, তা চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

সম্প্রতি বিএসইসি এ সংক্রান্ত একটি চিঠি ডিএসইর প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার (সিআরও) কাছে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে।

জানা গেছে, কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিএসই মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদনে উত্থাপিত বকেয়া ডিভিডেন্ডের অসঙ্গতি এবং হালনাগাদ না থাকা স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার নিয়ে নিরীক্ষক ও কোম্পানির কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবে।

এছাড়া কোম্পানিটি কোনো সিকিউরিটিজ আইন, বিধিমালা বা প্রবিধান লঙ্ঘন করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। একইসঙ্গে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), কোম্পানি সচিব ও নিরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের নাম ও ব্যাখ্যা সংগ্রহ করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে ডিএসই।

বিএসইসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের ২০.০১ নম্বর নোট অনুযায়ী ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বেশি ডিভেডেন্ড বকেয়া হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৬৬ টাকা নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার হালনাগাদ নয় এবং আলোচ্য সময়ে কোনো সম্পদ পুনর্মূল্যায়নও করা হয়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এসব বিষয় নিয়ে নিরীক্ষক ও কোম্পানির কাছ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা থাকলে তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে কমিশনে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের—পরিচালনা পর্ষদ, এমডি, সিএফও, কোম্পানি সচিব, নিরীক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের চিহ্নিত করে তাদের বক্তব্যসহ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। চিঠি জারির ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এই প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরীক্ষকের উত্থাপিত এই দুটি বিষয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ডিভিডেন্ড থাকা সত্ত্বেও তার বড় অংশ নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়া উদ্বেগের বিষয়।

আইন অনুযায়ী, ডিভিডেন্ড ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ আলাদা ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই কোম্পানির ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি, যা বিনিয়োগকারীদের অর্থপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পাশাপাশি কোম্পানির নগদ ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার হালনাগাদ না থাকা এবং পুনর্মূল্যায়নের অভাব আরও বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। এতে কোম্পানির প্রকৃত সম্পদের অবস্থা ও মূল্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কাগজে উল্লেখিত সম্পদের বাস্তব অস্তিত্ব থাকে না বা তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ ধরনের অবস্থায় সম্পদের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

এছাড়া দীর্ঘদিন সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন না হলে বাজারমূল্য ও বইমূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়, যা আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন করে। ফলে বিনিয়োগকারীরা সঠিক তথ্যের অভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমিশনের দৃষ্টিতে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে এ ধরনের অস্পষ্টতা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে সহায়ক হবে। বিএসইসির এ পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট, আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অস্বচ্ছতা আর সহ্য করা হবে না।

এসউদ্দিন/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত