ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩

ডিভিডেন্ড খরায় শেয়ারবাজারের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো

২০২৬ এপ্রিল ১৪ ১০:৪২:২০

ডিভিডেন্ড খরায় শেয়ারবাজারের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৫ সাল বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ডিভিডেন্ড প্রত্যাশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় ধরণের ধাক্কার বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশের শেয়ারবাজারের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এবং নিয়মিত ও আকর্ষণীয় ডিভিডেন্ড প্রদানের জন্য সমাদৃত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ডিভিডেন্ড প্রদানের হার আগের বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কমে গেছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত মোট ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে ডিভিডেন্ড ঘোষণার চিত্র বর্তমানে মিশ্র। এর মধ্যে আটটি কোম্পানি তাদের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও, বাকিগুলো এখনও বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। বাটা শু এবং ম্যারিকো বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও তাদের বছর শেষের চূড়ান্ত ডিভিডেন্ড এখনও অনিশ্চিত। বার্জার পেইন্টস এবং ম্যারিকোর হিসাব বছর মার্চ মাসে শেষ হওয়ায় তাদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্র পেতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস এখনও তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ১০টি বহুজাতিক কোম্পানি ২০২৫ অর্থবছরের জন্য মোট ৫ হাজার ৭০ কোটি টাকার ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। মূলত মুদ্রাস্ফীতির চাপ, কারখানা স্থানান্তর, ঐতিহাসিক লোকসান এবং প্রতিকূল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ডিভিডেন্ড বাবদ প্রায় ৪ হাজার ৩৪১ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে বাজারের দুই শীর্ষ কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ এবং গ্রামীণফোনের ডিভিডেন্ড কমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। বিএটি বাংলাদেশ আগের বছরের ৩০০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড থেকে নেমে এসে ২০২৫ সালে মাত্র ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ঢাকার কারখানা বন্ধ করে সাভারে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় ৭১৫ কোটি টাকার এককালীন খরচ এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৬৭ শতাংশ কমে গেছে। একইসাথে, টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ কোম্পানি গ্রামীণফোন তাদের ডিভিডেন্ডের পরিমাণ ৩৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১৫ শতাংশে নিয়ে এসেছে। গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে কোম্পানিটির মুনাফা কমে যাওয়ায় তারা নগদ অর্থ সংরক্ষণের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে।

এ বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল সিঙ্গার বাংলাদেশের ডিভিডেন্ডহীন ঘোষণা। তালিকাভুক্তির ইতিহাসে প্রথমবার কোম্পানিটি ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বাজারে টেকসই পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় কোম্পানিটি ২২৫ কোটি টাকার বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। এছাড়া লিন্ডে বাংলাদেশ আগের বছরের বিশেষ মূলধনী মুনাফার ধারা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরেছে, ফলে তাদের ডিভিডেন্ডের পরিমাণও কমেছে। একইভাবে র‍্যাক সিরামিকস লোকসানে থাকায় শুধুমাত্র সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু কোম্পানি ব্যতিক্রমী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। রবি আজিয়াটা এবং লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ তাদের মুনাফা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। রবির নিট মুনাফা ৭০২ কোটি থেকে বেড়ে ৯৩৮ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ায় তারা ডিভিডেন্ড ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৭.৫ শতাংশ করেছে। লাফার্জহোলসিমও মুনাফা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত হয়ে ডিভিডেন্ড ৩৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ ঘোষণা করেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সাল ছিল বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য টিকে থাকার বছর। উচ্চ আমদানি ব্যয়, ডলার সংকট এবং ভোক্তা পর্যায়ে ব্যয় সংকোচনের ফলে অধিকাংশ কোম্পানি ডিভিডেন্ড বিতরণের চেয়ে নিজেদের তারল্য এবং ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, বছরের এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত