ঢাকা, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২

দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরে হঠাৎ বড় লাফ

২০২৬ মার্চ ১৫ ১৬:১৮:১৯

দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দরে হঠাৎ বড় লাফ

নিজস্ব প্রতিবেদক: খেলাপি ঋণের পাহাড় আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চরম সংকটের মধ্যেও দেশের শেয়ারবাজারে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ‘টপ পারফর্মার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বেশ কিছু নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। অবসায়নের আশঙ্কায় কয়েক মাস ধরে টানা দরপতনের পর হঠাৎ করেই এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দামে অভাবনীয় উল্লম্ফন লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় থাকা আটটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর ১৪৫ শতাংশ থেকে ২২৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই নাটকীয় উত্থানের নেপথ্যে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে ডিএসইর একটি নতুন বাণিজ্যিক নিয়ম। অতি-স্বল্পমূল্যের শেয়ারগুলোর লেনদেন সচল করতে ডিএসই ১ টাকার নিচের শেয়ারের জন্য সর্বনিম্ন মূল্য পরিবর্তনের সীমা (টিক সাইজ) এক পয়সা নির্ধারণ করে দেয়। এর আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ১ টাকার নিচে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু নিয়ম পরিবর্তনের পর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির শেয়ার দর সর্বোচ্চ ২২৪ শতাংশ বেড়ে ৫ টাকা ৫০ পয়সায় টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে প্রিমিয়ার লিজিং ২১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ টাকা ৭০ পয়সায় এবং পিপলস লিজিং ও এফএএস ফাইন্যান্স উভয়েই ১৭৪ শতাংশ বেড়ে ১ টাকা ৭০ পয়সায় পৌঁছেছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, প্রাইম ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স এবং জিএসপি ফাইন্যান্সের শেয়ার দরেও একই ধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেছে।

বাজার বিশ্লেষকরা এই প্রবণতাকে মূলত ‘জাঙ্ক স্টক’ বা পচা শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া হিসেবে দেখছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের চেয়ে দ্রুত মুনাফার আশায় এসব দুর্বল শেয়ারের পেছনে ছুটছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের পর অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করছেন যে, আগে ঘোষিত অবসায়নের সিদ্ধান্ত হয়তো কার্যকর হবে না। এই ধারণা থেকেই বাজারে জল্পনা-কল্পনা ও কারসাজি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ মনে করেন, বাজারে ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের অভাব এবং কারসাজির কারণেই এ ধরনের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ঘটে, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শেষ পর্যন্ত তাদের কষ্টার্জিত অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন।

অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের জমানো লোকসান ৫,১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং তাদের খেলাপি ঋণের হার ৯৮ শতাংশ। পিপলস লিজিংয়ের লোকসান ৪,৮০০ কোটি টাকা এবং খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। এফএএস ফাইন্যান্সের অবস্থা আরও শোচনীয়, যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগ। এই চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যেই গত ২৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্সসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে বিআইএফসি, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্সকে তাদের আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ অনুযায়ী, আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ এবং দীর্ঘকাল লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অবসায়নের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে। এমন এক কঠোর আইনি ও আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও শেয়ার বাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের দাপট মূলত বাজার ব্যবস্থার এক বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

শেয়ারবাজার এর অন্যান্য সংবাদ