ঢাকা, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২

শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের মেরুকরণ: কোন শেয়ারে ঝোঁক আর কোথায় অরুচি?

২০২৬ মার্চ ১৪ ২১:৪৬:৫৯

শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের মেরুকরণ: কোন শেয়ারে ঝোঁক আর কোথায় অরুচি?

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আচরণে একটি মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং ও ওষুধ খাতের ব্লু-চিপ শেয়ারগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্রামীণফোন এবং ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের মতো বড় কোম্পানিগুলো থেকে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মাসে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনার মাধ্যমে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগে গতি এসেছে, যার নেতৃত্বে ছিল স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ব্র্যাক ব্যাংক।

ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল ওষুধ খাতের জায়ান্ট স্কয়ার ফার্মা। গত এক মাসে তারা কোম্পানিটির প্রায় ১৬০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন, যার ফলে জানুয়ারির ১৪.৭০ শতাংশ থেকে বিদেশি অংশীদারিত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.৫০ শতাংশে। এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটিতে গত মাসে বিদেশিরা প্রায় ১১০ কোটি টাকার শেয়ার কেনায় তাদের মালিকানা ৩৬.০৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬.৭২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক এবং আইডিএলসি ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠানেও বিদেশিদের সামান্য বিনিয়োগ বাড়তে দেখা গেছে। সব মিলিয়ে গত মাসে ২৫টি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিদেশিরা প্রায় ২৮০ কোটি টাকার শেয়ার সংগ্রহ করেছেন।

অন্যদিকে, কয়েকটি বড় কোম্পানি থেকে বিদেশিরা বড় অংকের বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রয় চাপ দেখা গেছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির প্রায় ৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন, যার ফলে তাদের মালিকানা ৩২.৮৩ শতাংশ থেকে কমে ৩০.২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। টেলিকম খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনেও একই চিত্র দেখা গেছে এবং বিদেশিরা প্রায় ২৫ কোটি টাকার শেয়ার ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়াও ডিবিএইচ ফাইন্যান্স, বিএসআরএম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েলে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। সব মিলিয়ে ১৬টি কোম্পানি থেকে তারা মোট ১২৬.৩৫ কোটি টাকা প্রত্যাহার করেছেন।

বিনিয়োগের এই কেনাবেচা চললেও বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশিদের সামগ্রিক অংশগ্রহণ এখনো বেশ সীমিত। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, বাজারে মোট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টিতে বিদেশিদের মালিকানা রয়েছে, যা বাজারে তাদের ক্ষুদ্র পরিসরেরই ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকে বিদেশিদের সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ এবং অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে ৩০ শতাংশের বেশি মালিকানা রয়েছে। এছাড়াও বেক্সিমকো ফার্মা, নাভানা ফার্মা এবং রেনাটায় তাদের উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব লক্ষ্য করা যায়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মানসম্পন্ন কোম্পানির অভাব এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা গুটিকয়েক ভালো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। পুঁজিবাজারে প্রচুর ‘জাঙ্ক স্টক’ বা দুর্বল কোম্পানি থাকায় বিদেশিরা বড় পরিসরে বিনিয়োগে সাহস পাচ্ছেন না। এর পাশাপাশি মূলধনী মুনাফা করের জটিলতা, নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা এবং করপোরেট সুশাসনের অভাবকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি বর্তমানে যে বিনিয়োগ রেকর্ড করা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই অনিবাসী বাংলাদেশিদের। প্রকৃত বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কেবল ২৫টির মতো বৃহৎ মূলধনী কোম্পানিতে সক্রিয় রয়েছেন, যেখানে নরওয়ের সার্বভৌম তহবিলসহ আরব আমিরাত ও ইউরোপের কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

তবে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক মূলধন প্রত্যাবাসনের নিয়ম কিছুটা শিথিল করেছে। গত ৯ মার্চ জারি করা এক সার্কুলারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে, এখন থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকে অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না, যা আগে ছিল মাত্র ১০ কোটি টাকা। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

শেয়ারবাজার এর অন্যান্য সংবাদ