ঢাকা, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২

শেয়ারবাজারকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের

২০২৬ মার্চ ০৮ ২৩:১২:২৯

শেয়ারবাজারকে ইমার্জিং মার্কেটে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে বর্তমান ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ অবস্থান থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো শেয়ারবাজারকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো। এতে মানুষ শুধু ভোক্তা হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির অংশীদার বা মালিক হিসেবেও যুক্ত হতে পারবেন।

রাজধানীর ফার্স হোটেলে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত “Challenges and Way Forward for the New Government in the Capital Market” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

বর্তমানে বৈশ্বিক সূচক নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মতে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। সাধারণত ছোট আকারের বা কম তারল্যসম্পন্ন উন্নয়নশীল বাজারগুলোকে এই শ্রেণিতে রাখা হয়, যেগুলো এখনও ইমার্জিং মার্কেটের পরিসর ও সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারেনি।

আলোচনায় তিতুমীর বলেন, শেয়ারবাজারকে রূপান্তর করতে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে স্থবিরতার পেছনে কারসাজি, স্বচ্ছতার অভাব এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

তার মতে, বাজারের ভেতরের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে কাজ না করলে বাইরের তদারকি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য বাজারে শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অডিটর, সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠান যদি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমে যাবে।

তিতুমীর আরও বলেন, অর্থনীতিতে অর্থায়নের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন কোম্পানি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করবে এবং কোন কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের জন্য শেয়ারবাজারে আসবে— নীতিনির্ধারকদের তা নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে বাজেটের ওপর নির্ভর না করে বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের প্রস্তাবও দেন। এতে শেয়ারবাজারে নতুন অর্থায়ন কাঠামো তৈরি হবে।

শেয়ারবাজারে নতুন আর্থিক পণ্যের বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে বন্ডভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে এবং বাজারে নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালু করতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দেশে একটি ইসলামিক স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দেন তিতুমীর। এতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশের বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হতে পারেন। একইসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ তৈরির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, শুধু ভোগ বা ঋণনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। এজন্য সমাজকে ঋণনির্ভরতা থেকে মালিকানাভিত্তিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে হবে। শেয়ারবাজার অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, বাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রায় ২০০টি তদন্ত পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জরিমানা করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, অতীতে শেয়ারবাজারে দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনা প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। বাজার নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে তা দূর করার পাশাপাশি টেকসই রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে হবে।

বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনায় আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলোর কথাও তুলে ধরেন। প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশে তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে— শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতে চাপ এবং কর আদায় কম হওয়া।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে আরও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আনার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, একটি শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, শেয়ারবাজারে ডিজিটালাইজেশন বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি উচ্চ তালিকাভুক্তি ফি অনেক কোম্পানিকে আইপিওতে আসতে নিরুৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার বলেন, গত দুই বছরে নতুন কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। তাই আইপিও মৌসুমে সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে কয়েকটি মানসম্মত কোম্পানিকে বাজারে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এএসএম/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত