×

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাবির ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মীদের অবাধ যাতায়াত, বাড়ছে অস্বস্তি

২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৬:৩১:১০

ঢাবির ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মীদের অবাধ যাতায়াত, বাড়ছে অস্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোতে পুরুষ অভিভাবকদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও হলের ভেতরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন পুরুষ কর্মচারী ও ক্যান্টিনের কর্মীরা। ক্যান্টিন পরিচালনা, পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন সেবার কাজে তাঁদের অবাধ চলাচলে আবাসিক ছাত্রীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুরুষ কর্মীদের অস্বস্তিকর আচরণের কারণে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত হলগুলোতেও তাঁদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে।

সাধারণভাবে ছাত্রী হলের ক্যান্টিন ও পরিচ্ছন্নতার কাজে নারী কর্মী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ছাত্রী হলেই এসব কাজে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। ক্যান্টিন পরিচালনার পাশাপাশি রাতে হাজিরা খাতা পৌঁছে দেওয়া ও সংগ্রহ করা, হলের সামনের অংশ পরিষ্কার করা, পত্রিকা কক্ষে পত্রিকা রাখা এবং গেমস ও সংস্কৃতিচর্চার কক্ষের তালা খোলা ও বন্ধ করার কাজও করছেন তাঁরা। হলের ভেতরে পুরুষ স্টাফ ও ক্যান্টিনকর্মীদের নিয়মিত যাতায়াত নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন নারী শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পক্ষ থেকে নারী হলগুলোতে নারী কর্মী নিয়োগের দাবি একাধিকবার প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাজেট বা তহবিলের সংকটের কথা বলায় নিয়োগপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে না বলে জানা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি প্রধান আবাসিক হল রয়েছে। এগুলো হলো রোকেয়া হল, শামসুন নাহার হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, কুয়েত মৈত্রী হল ও সুফিয়া কামাল হল। এ ছাড়া ছাত্রীদের জন্য কয়েকটি হোস্টেলও রয়েছে।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোসা. সিদ্দিকা জাহান শিফা জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৬টায় গেমস রুমের তালা খুলতে আসেন একজন পুরুষ কর্মী। কক্ষটির পাশেই ৩৬ আসনের একটি গণরুম, একটি রিডিং রুম ও একটি ওয়াশরুম রয়েছে। ওই কর্মী যাতায়াতের সময় সতর্কতামূলক বাঁশি না বাজানোয় ওয়াশরুম কিংবা রিডিং রুম থেকে বের হওয়ার সময় ছাত্রীরা প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। তাঁকে বাঁশি বাজাতে বলা হলে ওই কর্মী পাল্টা যুক্তি দেন, নিচ থেকে বাঁশি বাজালে শিক্ষার্থীদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

রাতের বেলায় প্রতিটি তলার লিফটের পাশে হাজিরা খাতা পৌঁছে দেওয়া ও পরে তা নিয়ে যাওয়া এবং অডিটোরিয়ামে পত্রিকা দেওয়ার দায়িত্বও পালন করেন পুরুষ কর্মীরা। নিয়ম অনুযায়ী দূর থেকে বাঁশি বাজিয়ে তাঁদের আসার কথা থাকলেও অনেকে তা অনুসরণ করেন না। এতে সিঁড়িতে ফোনে কথা বলা কিংবা অডিটোরিয়ামে পড়াশোনা করতে বসা ছাত্রীরা অস্বস্তিতে পড়েন। বিশেষ করে পর্দা মেনে চলা শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিদ্দিকা জাহান শিফা। তাঁর ভাষ্য, পুরুষ কর্মচারীরা সরাসরি ছাত্রীদের কক্ষের সামনে দিয়ে অবাধে যাতায়াত করেন। তাঁদের আশঙ্কা, এসব কর্মী চাইলে ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করে ওয়াশরুম কিংবা ছাত্রীদের কক্ষের ভেতরের দৃশ্য ধারণ করতে পারেন। এ ছাড়া পুরুষ কর্মীদের চলাচলের বারান্দাতেই শিক্ষার্থীরা দড়িতে কাপড় শুকাতে দেন। এমন পরিস্থিতিকে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পুরুষ কর্মীদের আচরণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তাঁদের ভাষ্য, কয়েকজন কর্মী ছাত্রীদের দিকে অস্বাভাবিকভাবে তাকিয়ে থাকেন। পোশাক সামান্য অবিন্যস্ত থাকলেও তাঁদের আপত্তিকর দৃষ্টির মুখে পড়তে হয়। নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি একজন ক্যান্টিনকর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন একাধিক সূত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রীদের সব হলেই এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। পর্দা মেনে চলা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ নারী শিক্ষার্থীরাও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারছেন না। সকালে হলের ভেতরের উঠানের মতো জায়গায় পুরুষ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দেন ও নালা পরিষ্কার করেন। এতে নিচতলার কক্ষগুলোতে থাকা ছাত্রীদের দরজার সামনেই অস্বস্তিতে পড়তে হয়। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় নিয়ম অনুযায়ী ক্রমাগত বাঁশি বাজানোর কথা থাকলেও অনেক কর্মী তা করেন না। কেউ কেউ হঠাৎ ছাত্রীদের সামনে এসে পড়ার পর বাঁশি বাজান, ফলে আগেভাগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকে না।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, কিছুদিন আগে দুপুরে তিনি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। সে সময় অসুস্থ এক রুমমেটকে হাসপাতাল থেকে হলে নিয়ে আসেন একজন পুরুষ ও একজন নারী কর্মচারী। পুরুষ কর্মচারীটি সরাসরি কক্ষের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কক্ষে আসবেন কি না।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের বাইরেও কবি সুফিয়া কামাল ও শামসুন নাহার হলে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রিডিং রুম ও গণরুম এলাকায় যাতায়াতের সময় পুরুষ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বাঁশি বাজান না, এমনকি দরজায় কড়া নাড়ার নিয়মও মানেন না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় তাঁদের কেউ কেউ ছাত্রীদের দিকে আপত্তিকর দৃষ্টিতে তাকান। হলের প্রবেশদ্বারে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

শামসুন নাহার হলের ছাত্রীরাও বলছেন, পুরুষ কর্মীদের ঘন ঘন যাতায়াত তাঁদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি করছে। ক্যান্টিনে পর্দা মেনে চলা ছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় প্লেট বা পানি দিতে গিয়ে পুরুষ কর্মীরা হঠাৎ প্রবেশ করেন। এতে তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

শামসুন নাহার হলের ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাক জাহান বলেন, ‘নারীদের হলে পুরুষ স্টাফদের আনাগোনা এমনিতেই আমাদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর। নিজেদের মতো একটু চলাফেরা করতে পারি না। সবদিকে ছেলে মানুষ। খাবার খেতে যাই তখন ক্যান্টিন বয় রা বারবার প্লেট নিতে আসে, খুবই বিরক্ত লাগে।’

নারী হলগুলোতে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা কমাতে ডাকসুর ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রী হলগুলোর অনেক জায়গায় এখনো পুরুষ কর্মীরা কাজ করছেন, যা দুঃখজনক। নারী কর্মী নিয়োগের জন্য তাঁরা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন কর্মী নিয়োগের মতো বাজেট বা তহবিল নেই। উল্টো প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডাকসু তহবিলের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

পুরুষ কর্মীদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে কবি সুফিয়া কামাল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ছালমা নাছরীন বলেন, ছাত্রী হলের কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলোর দায়িত্ব মেয়েরা পালন করতে পারেন না। তাঁর মতে, ক্যান্টিন পরিচালনার কাজ পুরুষ কর্মী ছাড়া সম্ভব নয়; নারী কর্মীরা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

শিক্ষার্থীদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে এক লিফটম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

প্রাধ্যক্ষ আরও বলেন, হল প্রশাসন এককভাবে এসব বিষয়ে দায় নিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন করে নারী কর্মী নিয়োগ দিলে এবং সব নারী কর্মচারী রাখার বিষয়ে সিন্ডিকেট নিয়ম অনুমোদন করলে হল প্রশাসন তা মেনে চলবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেই নির্দেশনা আসতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা প্রক্টর বা তাঁদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারী হলে কোনো পুরুষ কর্মীর অসদাচরণ কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য লিখিত অভিযোগ জমা দিতে হবে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

বিশ্ববিদ্যালয় এর অন্যান্য সংবাদ