×

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ফ্যামিলি কার্ডের আশায় টিপসই দিয়ে ‘বিয়ে হয়ে গেল’ আছিয়ার

২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১৯:৩৪:২৯

ফ্যামিলি কার্ডের আশায় টিপসই দিয়ে ‘বিয়ে হয়ে গেল’ আছিয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক: ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে আছিয়া বেগম (৪৩) নামে এক বিধবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়া হয়। পরে কার্ড তৈরির প্রক্রিয়ার কথা বলে একটি কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, আছিয়ার বিয়ে হয়ে গেছে। এ সময় তাঁর সামনে একটি কাবিননামা ও এফিডেভিট দেখানো হয়, যেখানে বর হিসেবে তাঁর পূর্বপরিচিত আবদুল কুদ্দুছের নাম রয়েছে।

সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সালিশ বৈঠকও করেছেন। আছিয়ার অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় জামায়াত নেতা আবদুস ছাত্তার কৌশলে তাঁর টিপসই নিয়েছেন। পরে সেই টিপসই ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।

আছিয়া জানান, প্রায় ১৩ বছর আগে তাঁর স্বামী আবু কালাম মারা যান। এরপর তিনি দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর নাতি-নাতনিও রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব পেলেও সন্তানদের কথা বিবেচনা করে আর বিয়ে করেননি।

আছিয়া বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে স্থানীয় জামায়াতকর্মী আবদুস ছাত্তার তাঁকে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলেন। তাঁর কথায় বিশ্বাস করে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি দেন তিনি। পরে টিপসই দেওয়ার জন্য তাঁকে আবার ডেকে নেওয়া হয়। স্বাক্ষর করতে না পারায় তিনি কাগজে টিপসই দেন। পরে জানতে পারেন, সেই টিপসই ব্যবহার করে তাঁর নামে কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমি বিয়েতে রাজি হইনি। ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নিয়ে এখন বলছে আমার নাকি বিয়ে হয়ে গেছে! আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি, কাজিও দেখিনি।”

আছিয়াকে বিয়ে করেছেন বলে যে আবদুল কুদ্দুছের নাম এলাকায় ছড়িয়েছে, তাঁর বাড়ি পাটুলী বাজারের পাশে। সেখানে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে ছিলেন তাঁর স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা।

সুফিয়া খাতুন জানান, বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল থেকেই তাঁর স্বামী বাড়িতে নেই। বিয়ের বিষয়ে কুদ্দুছ তাঁকে আগে কখনো কিছু জানাননি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কুদ্দুছ দাবি করেছেন, তিনি কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করেছেন।

সুফিয়া বলেন, “আমরা তাকে বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি কারও কথা শোনেননি।”

এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় উল্লেখ রয়েছে, পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজি গোলাম মোস্তফা বিয়েটি সম্পন্ন করেছেন। সেখানে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা উল্লেখ আছে। কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে।

তবে কাবিননামায় সাক্ষী হিসেবে নাম থাকা সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি কোনো কাবিনের সাক্ষী হননি। একই সঙ্গে তিনি ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।

বিয়ে সম্পন্ন করার অভিযোগের বিষয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মুঠোফোনে কাজি গোলাম মোস্তফা বলেন, “আমি এই বিয়ে সম্পন্ন করিনি। যে কাগজ ছড়িয়েছে সেটি সম্পূর্ণ জাল।”

তিনি জানান, এর আগেও ২০২০ সালে তাঁর নাম ব্যবহার করে এমন একটি জাল কাগজ তৈরি হয়েছিল। তখন তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এবারও কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আছিয়ার সঙ্গে আবদুল কুদ্দুছের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আছিয়ার ছেলের বিয়ের সময় কুদ্দুছকে উকিল শ্বশুর করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে কুদ্দুছের পক্ষ থেকে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

স্বামী মারা যাওয়ার পর কুদ্দুছ ছাড়াও আরও কয়েকজন আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানদের কথা বিবেচনা করে তিনি বিয়েতে রাজি হননি। মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেই সন্তানদের বড় করেছেন তিনি।

ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ রুস্তম আলী। তিনি জানান, আছিয়ার কাছে কাবিনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তাঁর টিপসই নেওয়ার কথা বলেন। কাবিননামায় থাকা সাক্ষীরাও সালিশে জানিয়েছেন, বিয়ের বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না।

রুস্তম আলী বলেন, “কীভাবে কী হলো, আমরা যাচাই করছি। সালিশের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।”

গত সোমবার ও বুধবার পাটুলী গ্রামে ঘটনাটি নিয়ে সালিশ বসে। তবে সেখানে অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুছ কেউ উপস্থিত ছিলেন না। পরে শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। সালিশে নেতৃত্ব দেওয়া রুস্তম আলী জানান, ওই সময়ের মধ্যে আবদুস ছাত্তার তাঁর অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আছিয়ার কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুস ছাত্তার। তিনি পাটুলী বাজারের কসমেটিকস ব্যবসায়ী। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুটিজানা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন।

আবদুস ছাত্তার বলেন, “আমি ওই মহিলার কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে কোনো টিপসই নিইনি। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।”

উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক (শামীম) বলেন, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে তারা খোঁজ নিয়েছেন। তাঁর দাবি, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের নিয়মিত পদধারী কোনো নেতা নন। নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপি করতেন বলেও জানান তিনি।

ফজলুল হক বলেন, “তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে আমাদের ধারণা। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের আইন অনুযায়ী বিচার হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।”

ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, বিভিন্নজনের কাছ থেকে তাঁরা ঘটনাটি শুনেছেন। তবে থানায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডের বিষয় ব্যবহার করে কেউ প্রতারণা করে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত