ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

তিস্তা প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ সহায়তার প্রস্তাব চীনের, চ্যালেঞ্জ কোথায়?

২০২৬ জুলাই ০৩ ১৫:৫৬:৫৮

তিস্তা প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ সহায়তার প্রস্তাব চীনের, চ্যালেঞ্জ কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক: তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনায় সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এ প্রকল্পে বেইজিংয়ের নতুন করে সক্রিয় আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করলেও, বাস্তবায়নের পথে ভারতের অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত মহাপরিকল্পনার শুরু থেকে প্রয়োজনীয় সব পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা দিতে চায় চীন। অর্থাৎ সমীক্ষা, প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন সব ধাপেই যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটি।

তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি বহু বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ প্রকল্পের সমীক্ষার কিছু কাজও করেছিল চীন। তবে ভারতের আপত্তির কারণে সে সময় সরকার এ বিষয়ে আর অগ্রসর হয়নি।

অন্যদিকে, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত চুক্তি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এ চুক্তির জন্য বাংলাদেশ তাগিদ দিয়ে আসছে।

প্রায় এক দশক আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। সে সময় ভারত সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অন্যতম বিষয় হলো তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকার গঠনের পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রকল্পকে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকার কথা জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিস্তার বৃহৎ প্রকল্পে সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে চীন। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় তাদের বিবেচনায় নেই।

ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ৫৪টি নদীর একটি তিস্তা। নদীটির উৎপত্তি ভারতের সোলামো লেকে। সেখান থেকে এটি সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে রংপুর জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং পরে কুড়িগ্রামের চিলমারির কাছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় তিস্তার তীর ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানির সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর, নিলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, নদীভাঙন কমবে এবং নদীকেন্দ্রিক শিল্প ও পর্যটনের সম্ভাবনাও সম্প্রসারিত হবে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, তিস্তার কোথাও পাঁচ কিলোমিটার, কোথাও তিন কিলোমিটার, আবার কোথাও দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃতি রয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করে এর প্রস্থ অনেক ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত করার চিন্তা করা হচ্ছে। এতে তিস্তার তীরবর্তী শত শত একর ভূমি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, যা ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসন কিংবা শিল্পায়নের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকার যেমন তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তেমনি চীনও এতে সহায়তা দিতে দৃঢ় আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া। সেখান থেকে তিনি চীন সফরে যান। বিশ্লেষকদের মতে, ওই সফরে আলোচিত দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর ও তিস্তা প্রকল্প ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর।

বিশ্লেষক হুমায়ুন কবিরের মতে, এ দুটি বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূলত ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বনাম ভারত। এর পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে ঘিরে আঞ্চলিক সমীকরণও রয়েছে। এই বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতাকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে, তার ওপরই সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

চার বছর পর ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল দেশের রিজার্ভ

চার বছর পর ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল দেশের রিজার্ভ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরেছে। প্রায় চার বছর পর রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম... বিস্তারিত