ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ঈদের মুখে হামের মহামারী: আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুমৃত্যু

২০২৬ মে ২৭ ১১:০৬:৫১

ঈদের মুখে হামের মহামারী: আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুমৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে হামের সংক্রমণ এখন আর সাধারণ স্তরে নেই, বরং তা মারাত্মক মহামারী রূপ ধারণ করেছে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি থেকে অনায়াসে ১২ থেকে ১৮ জনের শরীরে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটি ও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের ব্যাপক চলাচল ও সামাজিক মেলামেশা শুরু হলে এই সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রথাগত হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে এই গণসংক্রমণ সামাল দেওয়া অসম্ভব। তাই ভাইরাসের বিস্তার রোধে যেকোনো বয়সী মানুষ বা শিশুর জ্বর দেখা দিলে তাকে দ্রুত আইসোলেশনে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বর্তমানে আক্রান্তের গ্রাফের পাশাপাশি মৃতের সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে লাফিয়ে বাড়ছে। চলতি মাসে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি শিশু হামের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে, যা গত মাসেও ছিল দৈনিক ৯ জন। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হামে শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। যেহেতু এই মুহূর্তে সংক্রমণ পুরোপুরি অবরুদ্ধ করা কঠিন, তাই এখন পুরো রাষ্ট্রীয় মনোযোগ দেওয়া উচিত মূলত শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ওপর।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেনের মতে, হাম যেহেতু মহামারী পর্যায়ে চলে গেছে, তাই সংক্রমণ কিছু ক্ষেত্রে ছড়াবেই। এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত— আক্রান্ত রোগী যেন সংকটাপন্ন হয়ে মারা না যায়। এই জন্য লক্ষণ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রোগীকে দ্রুততম সময়ে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হামে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপুষ্টি। গ্রাম ও শহরের দরিদ্র, ভাসমান এবং বস্তি এলাকার শিশুরা এই ঝুঁকিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। যেহেতু এসব প্রান্তিক পরিবারের পক্ষে ঘরের ভেতর আলাদা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা বিলাসিতা, তাই বড় হাসপাতালের পাশে তাঁবু গেড়ে জরুরিভিত্তিতে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করা যেতে পারে। এতে যেমন রোগীরা দ্রুততম সময়ে সেবা পাবে, তেমনি মূল হাসপাতালের ওপর থেকেও উপচে পড়া রোগীর চাপ কমবে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে ১০ মাস বয়সী শিশু মোহাম্মদ বায়েজিদের চিকিৎসায়। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে টানা ১০ দিন ভর্তি থেকে হামের চিকিৎসা নিয়েছে সে। একই সময়ে তার অপর দুই ভাইবোনও আক্রান্ত হয়ে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মা খাদিজা বেগম জানান, প্রথমে ছোট ছেলের হাম হওয়ার পর বাকি দুই সন্তানও এতে আক্রান্ত হয়। রোগটি যে এত দ্রুত ছড়ায়, তা তাঁর জানা ছিল না। দুই আলাদা শহরে তিন সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটিকে চড়া ব্যয়ের পাশাপাশি চরম হিমশিম খেতে হয়েছে।

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জনস্বাস্থ্য খাতে কাজ করা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল এই সংকট মোকাবিলায় আইসিডিডিআর’বি (icddr,b)-এর মহামারী সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু হাসপাতালের ওপর ভরসা না করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কমিউনিটি সেন্টার, অব্যবহৃত বড় খালি ভবন বা মার্কেটগুলোকে সাময়িকভাবে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে রূপান্তর করা দরকার, যেখানে আক্রান্তদের দ্রুত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিসহায়তা নিশ্চিত করা যাবে।

পরিশেষে জনস্বাস্থ্যবিদরা স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, ঈদের ছুটির আগে ও পরে ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরতে হলে এখনই যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নিতে হবে। তৃণমূল বা কমিউনিটি পর্যায়ে দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন, সঠিক চিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমেই কেবল এই অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুমৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

সাত দিনের ছুুটিতে সীমিত পরিসরে আজও খোলা ব্যাংক

সাত দিনের ছুুটিতে সীমিত পরিসরে আজও খোলা ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও পুরোপুরি বন্ধ থাকছে না দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রম। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ... বিস্তারিত