ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ৩১ চৈত্র ১৪৩৩
নিরাপদ মুনাফার খোঁজে ব্যাংকগুলো; বঞ্চিত হচ্ছে উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতের মূল কাজ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ দিয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখা। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার বড় কোনো বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগে ঢুকলে দেখা যাবে এক অবিশ্বাস্য চিত্র। ব্যাংকগুলো এখন আর কলকারখানা বা নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহী নয়, বরং তাদের মূল মনোযোগ এখন সরকারি বন্ড বা সিকিউরিটিজ কেনায়। বর্তমানে একটি ব্যাংকের আয়ের প্রতি ১০ টাকার মধ্যে ৬ থেকে ৮ টাকাই আসছে সরকারি বিনিয়োগ থেকে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা একে ‘সার্বভৌম-ব্যাংক নেক্সাস’ বা একটি আত্মঘাতী ফাঁদ হিসেবে অভিহিত করছেন। এই প্রক্রিয়ায় সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। এর ফলে শিল্প প্রবৃদ্ধি কমছে, রাজস্ব আয় সংকুচিত হচ্ছে এবং সরকারকে খরচ মেটাতে আরও বেশি করে নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ট্রেজারি বিলের মুনাফার হার ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২.৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ সাধারণ আমানতকারীদের আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলো এর চেয়ে ২ থেকে ৪ শতাংশ কম মুনাফা দিচ্ছে। এই ব্যবধানের সুবিধা সরাসরি ভোগ করছে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা এবং সরকার, যারা সাধারণ মানুষের জমানো টাকায় সস্তায় নিজেদের অর্থায়ন নিশ্চিত করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমেছে, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৪ শতাংশে পৌঁছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমাও অতিক্রম করেছে। শিল্পায়নের অন্যতম সূচক মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১০.৪৩ শতাংশ কমেছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ স্থবিরতার স্পষ্ট সংকেত। বর্তমানে সরকারি ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশই ব্যাংকগুলোর হাতে আটকে আছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরকার এখন আগের নেওয়া ঋণ শোধ করার জন্যই নতুন করে বাজার থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর এই আচরণের পেছনে কিছু নিয়ন্ত্রক সুবিধাও কাজ করছে। আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের ঝুঁকি শূন্য হিসেবে ধরা হয়, যেখানে বেসরকারি ঋণে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। ফলে ব্যাংকগুলো কোনো জামানত বা সঞ্চিতি রাখার ঝামেলা ছাড়াই সরকারি বন্ড থেকে ১০-১২ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা তুলে নিচ্ছে। যেখানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০.৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, সেখানে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না কোনো প্রতিষ্ঠানই। উদাহরণস্বরূপ, ব্র্যাক ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় গত পাঁচ বছরে চারগুণ বেড়েছে, যেখানে অনেক ব্যাংকের প্রকৃত ঋণের সুদ থেকে আসা আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে টাকা সরিয়ে আস্থাশীল ব্যাংকগুলোতে জমা করলেও, সেই অর্থ শিল্প খাতে না গিয়ে সরাসরি সরকারি বন্ডে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এটি অন্তত ১১ শতাংশে নিতে পারলে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে সরাসরি ট্রেজারি বিল কেনার সুযোগ দেওয়া উচিত যাতে বিনিয়োগের উৎস বহুমুখী হয়। ২০২৫ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণের ঝুঁকি ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
এমজে/
শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- চলছে বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের ম্যাচ: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণ ও আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ
- ৫৪ জেলায় টিসিবির ডিলার নিয়োগ, আবেদন শুরু ১০ মে
- পে স্কেলের প্রস্তাবিত গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো প্রকাশ
- ঢাবিতে প্রথমবারের মতো আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি কর্মশালা
- ঢাবির নতুন প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল
- ঈদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি, মাদরাসায় টানা ২১ দিন বন্ধ
- প্রথমবারের মতো নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য পেলো কুবি
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফের চালু বেত্রাঘাত! কার্যকর যেদিন থেকে
- রবির মুনাফায় আকাশচুম্বী প্রবৃদ্ধি, ব্যাকফুটে শিপিং কর্পোরেশন
- ঈদকে সামনে রেখে মুনাফা তুলছেন বিনিয়োগকারীরা
- পদত্যাগ করলেন ঢাবি শিক্ষক মোনামি
- বাংলাদেশিদের স্কলারশিপ দেবে যুক্তরাষ্ট্রের সিমন্স ইউনিভার্সিটি, আবেদন শুরু
- কলকাতায় অমিত শাহ, কে হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী
- এমপিও শিক্ষকদের ঈদ বোনাস কবে, যা জানা গেল