ঢাকা, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি, রপ্তানিতে বড় সুযোগ

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৫ ২২:৩৯:৫৭

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি, রপ্তানিতে বড় সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশা জাগিয়েছে। এই সমঝোতার ফলে বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিবৃতিতে জানায়, প্রায় নয় মাস ধরে চলা ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা সহজ হবে এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ খুলবে।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেন। পরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হলেও দরকষাকষির মাধ্যমে তা কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এনবিআর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

চুক্তির আওতা বিস্তৃত

চুক্তিটি শুধু শুল্ক হ্রাসে সীমাবদ্ধ নয়; এতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপস চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামোর সদস্য হওয়ায় এই শুল্ক চুক্তিতে নতুন কোনো অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। বরং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

তৈরি পোশাকে বিশেষ সুবিধা

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য চুক্তিতে বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা বা কৃত্রিম সুতা আমদানি করে সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক, ফলে এই সুবিধা রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে সহায়ক হবে।

শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ২,৫০০টি পণ্য শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এসবের মধ্যে ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত সামগ্রীসহ নানা পণ্য রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৭,১৩২টি ট্যারিফ লাইনের অফার দিয়েছে। এর মধ্যে ৪,৯২২টি পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে (যার মধ্যে ৪৪১টি আগেই শূন্য শুল্ক ছিল)। আরও ১,৫৩৮টি পণ্যে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক শূন্যে নামানো হবে এবং ৬৭২টি পণ্যে ১০ বছরের মধ্যে একই সুবিধা দেওয়া হবে। তবে ৩২৬টি ট্যারিফ লাইনে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জন্য ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতি ও ডিজিটাল বাণিজ্য

চুক্তিতে পেপারলেস ট্রেড চালু করা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার করা এবং ই-কমার্সে স্থায়ী মরাটোরিয়াম সমর্থনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগদানের প্রস্তাবেও বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে তাদের এফডিএ সনদের ভিত্তিতে বাজার অনুমোদনের সুযোগ দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য, দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রি আমদানিতে মার্কিন সনদ গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক এসপিএস কাঠামো অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে। উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার অঙ্গীকার রয়েছে।

এছাড়া বীমা, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা শিথিল করা, দুর্নীতিবিরোধী বিধান কার্যকর করা, আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী শ্রম আইন হালনাগাদ এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ডিজিটাল বাণিজ্যে সিবিপিআর, পিআরপি ও পিডিপিও স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বোয়িং উড়োজাহাজ, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর প্রচেষ্টার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।

রুলস অব অরিজিন ও এক্সিট ক্লজ

রুলস অব অরিজিনে নির্দিষ্ট ভ্যালু অ্যাডিশনের হার উল্লেখ না থাকায় শুল্ক সুবিধা পাওয়া তুলনামূলক সহজ হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অনুরোধে চুক্তিতে একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনে চুক্তি থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেবে—অন্য অনেক দেশের চুক্তিতে এ ধরনের বিধান নেই।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ মোট ১৫টি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত