ঢাকা, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের শাসনকাঠামো

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৪ ১৫:৪০:১৫

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের শাসনকাঠামো

ডুয়া ডেস্ক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনপদ্ধতির গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে আয়োজিত ঐতিহাসিক জাতীয় গণভোটে দেশের মানুষ বিপুল ব্যবধানে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের এই মহাজনাদেশ কেবল একটি ভোটের জয় নয়, বরং এটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার চিরস্থায়ী বিলোপ ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আইনি ভিত্তি প্রদান করেছে। এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিনের এককক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার অবসান ঘটে দেশ এখন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও আমূল পরিবর্তিত এক সংবিধানের পথে যাত্রা শুরু করল।

সংসদীয় কাঠামো ও প্রতিনিধিত্বে বড় পরিবর্তন

গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ এখন থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। ৩০০ আসনের নিম্নকক্ষের পাশাপাশি দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চকক্ষের সমর্থন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংরক্ষিত আসন ৫০টি থেকে পর্যায়ক্রমে ১০০-তে উন্নীত করা হবে। সংসদে গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এখন থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদগুলো বিরোধী দল থেকে মনোনীত করা হবে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও বিশেষ দায়িত্ব

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে তাঁরা নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শেষ করবেন। এরপর তাঁরা নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে কাজ শুরু করবেন।

রাষ্ট্রের মূলনীতি ও জাতীয় পরিচয়

সংবিধানের মূলস্তম্ভে বড় পরিবর্তন আসছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে এখন থেকে দেশের মানুষের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি হবে সংবিধানের নতুন মূলনীতি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সব মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এছাড়া নাগরিকের মৌলিক অধিকারে যুক্ত হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহারের নিশ্চয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য

নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি তাঁর জীবনে সর্বমোট ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাশ টানতে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে। এমনকি অপরাধীকে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা সংকুচিত করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতির বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।

বিচার বিভাগ ও নিয়োগে স্বচ্ছতা

জুলাই সনদ অনুযায়ী, বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে এবং নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হবে। নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি ও সিএজি নিয়োগের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে শক্তিশালী বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া, সংবিধানের বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হচ্ছে, যার ফলে বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বিপক্ষেও ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা পাবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থা

সংবিধানে পুনরায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বা ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নাম থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের একক আধিপত্য কমিয়ে সেখানে বিশেষজ্ঞ কমিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

জনমতের পরিসংখ্যান ও চ্যালেঞ্জ

এবারের ঐতিহাসিক গণভোটে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে সংস্কারের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। উল্লেখ্য, এই জুলাই সনদের কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেও গণভোটের বিপুল রায় সেসব সংশয় কাটিয়ে সংস্কারের পথ সুগম করেছে।

দেশের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো অনুষ্ঠিত এই গণভোটটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই জনাদেশ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও পরবর্তী সংস্কারগুলোর কোনো আইনি বৈধতা থাকত না। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার মাধ্যমে এখন বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের সকল প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত