ঢাকা, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২

৩৬০ মিটার, মোবাইল নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষমতার রাজনীতি: নিরাপত্তার নামে কতটা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য?

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৯ ১৬:১৬:১০

৩৬০ মিটার, মোবাইল নিষেধাজ্ঞা ও ক্ষমতার রাজনীতি: নিরাপত্তার নামে কতটা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য?

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকের আস্থা, রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার নৈতিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রের চারপাশে ৪০০ গজ (প্রায় ৩৬০ মিটার) এলাকাজুড়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে-রাষ্ট্র কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, নাকি নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?

নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, জেনারেশন জেড ও আলফা জেনারেশনের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এটিকে দেখছে ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হিসেবে। তাদের চোখে এটি কেবল প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা নয়; এটি নাগরিক নজরদারি কমিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল।

৩৬০ মিটার ও নিরাপত্তার বাস্তবতা-

৩৬০ মিটার দূরত্ব কতটা বড়- তা বোঝাতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। বিশ্বের দ্রুততম মানব উসাইন বোল্ট ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেছিলেন মাত্র ৯.৫৮ সেকেন্ডে, এটাই ছিল বিশ্ব রেকর্ড। সেই হিসাবে ৩৬০ মিটার অতিক্রম করতে তার প্রয়োজন হতো প্রায় ৩৫ সেকেন্ড। একজন সাধারণ মানুষ এই দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় নেয় মিনিমাম মিনিট দুই এক। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে- ভোটকেন্দ্র থেকে এত দূরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখলে কীভাবে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? কোনো অনিয়ম, সহিংসতা বা জরুরি পরিস্থিতি ঘটলে তথ্য দ্রুত পৌঁছাবে কীভাবে? মোবাইল ছাড়া এই এলাকা কার্যত একটি 'নীরব অঞ্চল'-এ পরিণত হয়। নিরাপত্তা মানে শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়; তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করাও নিরাপত্তার অংশ। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই পথ সংকুচিত করছে কি না- এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

জামাল খাশোগি ও আধুনিক নিরাপত্তার সীমা-

আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক কনস্যুলেটের মতো সুরক্ষিত স্থানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মধ্যেই তাকে হত্যা করা হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এই অপরাধ ঠেকানো যায়নি। এই ঘটনা প্রমাণ করে-নিরাপত্তা কেবল ভৌত নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় না। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক নজরদারি থেকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো-মোবাইল নিষিদ্ধ করে কি আমরা সত্যিই নিরাপত্তা বাড়াচ্ছি, নাকি সমস্যাকে আড়াল করছি?

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: নিষেধ নয়, নিয়ন্ত্রণ-

বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা হয়। ভারত: মোবাইল বহন বৈধ, তবে ছবি ও ভিডিও নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র: অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে মোবাইল রাখা যায়, ব্যালটের ছবি তোলা অপরাধ। যুক্তরাজ্য: মোবাইল অনুমোদিত, গোপন ভোট ভঙ্গ করলে শাস্তিযোগ্য। কানাডা ও জার্মানি: সীমিত ব্যবহার অনুমোদিত। এই দেশগুলো প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ না করে আইন প্রয়োগ ও সচেতনতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ কেন নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিল- এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট। আমাদের RPO ও কিন্তু এদের মতোই প্রায়।

আইনি কাঠামো ও সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব-

বাংলাদেশের নির্বাচন পরিচালনার মূল আইন RPO মোবাইল নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরাসরি কিছু বলে না। নির্বাচন কমিশন প্রশাসনিক ক্ষমতার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো বিধিনিষেধ হতে হবে যুক্তিসংগত, প্রয়োজনীয় এবং আনুপাতিক। ৩৬০ মিটার জুড়ে নিষেধাজ্ঞা এই পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ- তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আইন মতে, মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ক্ষতির নীতি মানা জরুরি। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ক্ষমতার রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি-

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতা নতুন নয়। প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই বাস্তবতায় মোবাইল নিষেধাজ্ঞা অনেকের কাছে ক্ষমতার কেন্দ্রের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। তরুণদের ধারণা- নজরদারি কমালে জবাবদিহিও কমে। এটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্কের প্রতিফলন।

তরুণ সমাজ ও ‘ষড়যন্ত্র’ ধারণা-

তরুণদের মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ বোধ আবেগ থেকে নয়, অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে। বিতর্কিত নির্বাচন, সীমিত পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক সহিংসতার স্মৃতি তাদের মানসিকতায় গভীর ছাপ ফেলেছে। মোবাইল তাদের কাছে আত্মরক্ষার মাধ্যম। অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহের শেষ ভরসা। সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়াকে তারা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করছে

বিকল্প পথ: নিয়ন্ত্রণ নয়, জবাবদিহি-

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর বিকল্প রয়েছে:

১. স্বাধীন ও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।

২. সিসিটিভি ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং।

৩. দ্রুত অভিযোগ ও হটলাইন ব্যবস্থা।

৪. প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

এই ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হলে নিষেধাজ্ঞা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। একটি শক্তিশালী কমিশন কেবল নির্দেশ দেয় না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমান সিদ্ধান্তে সেই অংশগ্রহণমূলক চর্চার ঘাটতি স্পষ্ট। জনগণকে না বোঝিয়ে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

পরিশেষে, নিরাপত্তা না আস্থা?

৩৬০ মিটার মোবাইল নিষেধাজ্ঞা আজ একটি প্রতীকী ইস্যু। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সংকটকে প্রকাশ করছে। নিয়ন্ত্রণ সাময়িক শৃঙ্খলা আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র দুর্বল করে। জামাল খাশোগির ঘটনা থেকে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়-স্বচ্ছতাই প্রকৃত নিরাপত্তা। জেনারেশন জেড ও আলফা জেনারেশনের চোখে এই নির্বাচন তাদের নাগরিক মর্যাদার পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই রাষ্ট্র কি নিয়ন্ত্রণ বেছে নেবে, নাকি আস্থাকে শক্তিশালী করবে? এই উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।

মো. সায়েদুর রহমান।

সহযোগী অধ্যাপক

ব্যাবসায় প্রশাসন বিভাগ,মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত