ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
গুলশান-বারিধারার লেক ঠিক না হলে দেশ কীভাবে ঠিক করব: গণপূর্ত মন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক: গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানির মান ঠিক করা সম্ভব না হলে পুরো দেশের পরিস্থিতি কীভাবে উন্নত করা যাবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, শুধু গুলশান, বনানী, বারিধারা লেক ও হাতিরঝিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সঙ্গে প্রায় ছয়বার বৈঠক করেছেন।
এসব এলাকার পরিবেশ উন্নয়নে কীভাবে কার্যকরভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে উদ্যোগ চলছে বলে জানান গণপূর্ত মন্ত্রী। তিনি বলেন, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০টি বাড়িঘর রয়েছে। এর মধ্যে বোধহয় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবনে নিয়ম অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক বা সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) থাকার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ’ শীর্ষক স্মার্ট সিটি কনক্লেভে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন জাকারিয়া তাহের।
রাজধানীতে নামিদামি ডেভেলপারদের নির্মাণ করা অনেক ভবনেও এসটিপি করা হয়নি বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, এর ফলে স্যুয়ারেজের পানি স্টর্ম ওয়াটারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে গুলশান, বনানী ও বারিধারা সোসাইটির সঙ্গে তিন-চারবার বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে তাঁদের চেয়ারম্যান, প্রতিমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন। নিজেও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছেন বলে জানান তিনি। জাকারিয়া তাহের বলেন, এটি সবার দায়িত্ব। শুধু গুলশান-বারিধারার মতো একটি বিশিষ্ট এলাকার লেকের পানি যদি আমরা ঠিক করতে না পারি, তাহলে সারা বাংলাদেশ কীভাবে ঠিক করব?
প্রথমবারের মতো প্রায় ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। শুরুতে দেশের মেট্রোপলিটন সিটিগুলোকে পরিকল্পনার আওতায় নেওয়া হচ্ছে। এরপর বড় শহর এবং পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সারাদেশকে এর অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রকৃত মাস্টারপ্ল্যান করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে জোনিং করে কোথায় কী হওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করা হবে। সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করার লক্ষ্যেই নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরকে (ইউডিডি) শক্তিশালী করা হচ্ছে এবং এই বিভাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
জাকারিয়া তাহের বলেন, পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য-উপাত্ত থাকা প্রয়োজন। সর্বশেষ যে আদমশুমারি হয়েছে, সেটিও অনেকদিন আগের। তাঁর বিশ্বাস, আরেকটি সঠিক আদমশুমারি করা উচিত, যাতে সেই তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা যায়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে বেশ কিছু কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ)। আগে শুধু একজন আর্কিটেক্টের মাধ্যমে একটি প্ল্যান পাস হতো। এখন আর্কিটেকচার, স্ট্রাকচারাল, ইলেকট্রিক্যাল ও প্লাম্বিং—সবকিছু সমন্বয় করে প্ল্যান জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। অনুমোদনের পর নির্মিত ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পাওয়ার সময় যারা ডিজাইন করেছেন, তাঁদেরই ভবনটি যথাযথভাবে নির্মিত হয়েছে বলে সার্টিফাই করতে হবে।
তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো, শুধু ঢাকা শহরের কথা বললে রাজউকের আওতাধীন এলাকা এবং গণপূর্তের আওতাধীন ধানমন্ডির মতো এলাকায় প্ল্যান পাস হচ্ছে। এর বাইরে পর্যাপ্ত অনুমোদন ছাড়া অনেক ভবন রয়েছে। এসব ভবন এখন শনাক্ত করা হচ্ছে।
গত সাত মাসে বেশ কিছু কাজ হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, রাজউকের মতো আরও ছয়টি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি করা হয়েছে। এগুলো হলো ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও বরিশাল। এর আগে আরও চারটি ছিল। পর্যায়ক্রমে আগামী সেশনে বগুড়া নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। অনেক শহরে ডেভেলপমেন্ট অথরিটি না থাকায় সিটি করপোরেশন ও ডেভেলপমেন্ট অথরিটি একইসঙ্গে পরিকল্পনা অনুমোদনসহ বিভিন্ন কাজ করছে। এতে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকে না।
যাঁরা এরই মধ্যে প্ল্যান ছাড়া ভবন নির্মাণ করেছেন অথবা অনুমোদিত প্ল্যানে বিচ্যুতি ঘটিয়েছেন, তাঁদের জন্য একটি বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। এ নিয়ে কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এটি হয়তো মন্ত্রিসভায় উঠবে। বিধিমালাটি পাস হলে সংশ্লিষ্ট আইন আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে সুপারভিশন আইনও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান ঢাকা শহরের অবস্থা দুঃখজনক উল্লেখ করে গৃহায়ন মন্ত্রী বলেন, ১৭৩টি শহরের মধ্যে আমরা ১৭১তম অবস্থানে আছি। পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। তবে এটিও বাস্তবতা যে, আমরা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরের মধ্যে আছি। সঠিক পরিকল্পনা এবং সব সেক্টরের সম্মিলিত অবদান ছাড়া এটিকে সফল করা খুবই কঠিন। বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারের পক্ষ থেকে আরও সুস্থ পরিবেশ, পরিবেশ রক্ষা এবং সঠিক আবাসন নীতিমালা তৈরি করে জনগণকে আরও ভালো সুযোগ দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর জনসংখ্যা, আবাসন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে একসঙ্গে পরিকল্পনার আওতায় না আনলে বাসযোগ্য ঢাকা তৈরি করা সম্ভব নয়। ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে। কিন্তু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা বস্তি উচ্ছেদ করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
টোকিওর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, জাপান কয়েক দশক ধরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। আমাদেরও পাঁচ বছরের পরিকল্পনা করে ২৫-৩০ বছর ধরে তা বাস্তবায়ন করার প্রবণতা থেকে বের হতে হবে।
মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর দুরবস্থার অন্যতম কারণ আইন না মানার প্রবণতা। রাজউকের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের দায়িত্ব ভবন মালিক ও ডেভেলপারদের। রাজউক নকশা অনুমোদন করে। প্রতিটি বাড়ি কীভাবে নির্মিত হচ্ছে, তা নিয়মিত পুলিশিংয়ের মতো করে নজরদারি করা সম্ভব নয়। মাত্র প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শতাধিক পরিদর্শক দিয়ে পুরো ঢাকার ভবন পর্যবেক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব থেকে আইন মানতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবাদাতা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
তিনি জানান, গ্রিন বিল্ডিংয়ে ৫ শতাংশ প্রণোদনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনে অতিরিক্ত ফ্লোর স্পেস, ভবনের নকশায় সৌরবিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত করা এবং এক বিঘা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে ১০ শতাংশ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ভবনে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ব্যবহারের দিকেও যাওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থকোয়েক সেফটি ও গবেষণার জন্য জায়গা ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার বা রাজউকের পাশাপাশি ডেভেলপার, ভবন মালিক, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
কনক্লেভে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, এবিসি রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত, স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ, ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির এমডি ও সিইও নাসিমুল বাতেন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরি, ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, নাসির সিনট্যাক্স গ্রুপের এমডি নাসিম বিশ্বাস এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম।
ইমামুল
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ৪৩ পদে নিয়োগ দেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, আবেদন অনলাইনে
- ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ
- প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৫৩৮ পদে নিয়োগ, আবেদনের শেষ সময় ৬ অক্টোবর
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৫ অক্টোবর)
- মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ, বাংলাদেশে দেখবেন যেভাবে
- অক্টোবরে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা মন্ত্রণালয়ের
- পে স্কেল বাস্তবায়নে মাউশির নতুন নির্দেশনা
- বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষকদের সেপ্টেম্বরের বেতন-ভাতার চেক ছাড়
- ব্রাজিল বনাম ভারত: সরাসরি দেখুন এখানে
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১০ দিনের ছুটির সুযোগ
- আজকের নামাজের সময়সূচি (২ অক্টোবর)
- ৯ গোল খেয়ে দুই ফুটবলারের ‘নারীসঙ্গ’ নিয়ে যা জানা গেল
- এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আলাদা প্রজ্ঞাপন লাগবে না
- যে কারণে স্থগিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন্স ম্যাচ
- শিশুশ্রম বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের