ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

যেভাবে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হলেন ইলন মাস্ক

পার্থ হক

রিপোর্টার

২০২৬ জুন ১৩ ১৬:২২:১৩

যেভাবে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হলেন ইলন মাস্ক

পার্থ হক: একসময় অনলাইন পেমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এক তরুণ উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে মহাকাশ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতে প্রভাব বিস্তার ইলন মাস্কের যাত্রা ছিল অসাধারণ। এবার সেই যাত্রায় যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাইলফলক। বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। ট্রিলিয়ন ডলার বলতে বোঝায় এক হাজার বিলিয়ন ডলার বা ১ সংখ্যার পর ১২টি শূন্য। বাংলায় যার পরিমাণ এক লাখ কোটি।

বেশ কিছু সময় ধরেই বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় শীর্ষস্থান বা তার কাছাকাছি অবস্থান করে আসছেন মাস্ক। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি নিট সম্পদের মালিক হন। এর এক মাস পর টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তার জন্য একটি রেকর্ড পরিমাণ পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন করেন, যার সম্ভাব্য মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।

তবে ২০২৬ সালের জুনে তার মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পর সম্পদের পরিমাণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। স্পেসএক্সের অধীনে এক্স, গ্রক এবং স্টারলিংকও রয়েছে। এর ফলে মাস্কের সম্পদ বিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে প্রবেশ করে।

বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হলেও কেবল সম্পদের জন্যই আলোচিত নন মাস্ক। স্পেসএক্সের প্রধান হিসেবে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রযুক্তি, রাজনীতি, মানবজাতির ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত মতামত দিয়ে থাকেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনীতিতেও তার সম্পৃক্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এতে কিছু বিনিয়োগকারীর অসন্তোষও দেখা দেয়। পাশাপাশি এক্স প্ল্যাটফর্ম জনমত গঠনে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক ও সরকারপ্রধানদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া মাস্ক ছোটবেলা থেকেই ব্যবসায়িক উদ্যোগের পরিচয় দেন। ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতে তৈরি চকলেট ইস্টার ডিম বিক্রি করতেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি নিজের প্রথম কম্পিউটার গেম তৈরি করেন। শৈশবের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, স্কুলে বুলিং এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের কারণে সামাজিক যোগাযোগে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।

পরবর্তীতে তিনি কানাডা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তার প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্ক ২০১০ সালে ম্যারি ক্লেয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক লেখায় উল্লেখ করেন, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার আগেই মাস্ক ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি ‘না’ শব্দটি সহজে মেনে নিতেন না।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হলেও তিনি দ্রুতই পড়াশোনা ছেড়ে ব্যবসায় মনোযোগ দেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি দুটি প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন। এর একটি পরবর্তীতে পেপ্যালে রূপ নেয় এবং ২০০২ সালে ই-বে সেটি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়।

সেই অর্থ দিয়ে তিনি স্পেসএক্সে বিনিয়োগ করেন, যার লক্ষ্য ছিল মহাকাশ প্রযুক্তির খরচ কমানো। একই সঙ্গে টেসলায় বিনিয়োগ করে ২০০৮ সালে কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী হন। পরবর্তীতে দুটি প্রতিষ্ঠানই নিজ নিজ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।

তার অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে টুইটার অধিগ্রহণ, যার নাম পরে পরিবর্তন করে এক্স রাখা হয়। মাস্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো এক্সকে এমন একটি ‘সবকিছুর অ্যাপ’-এ পরিণত করা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের সেবা এক জায়গায় পাওয়া যাবে। তবে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ৪৪ বিলিয়ন ডলারে কেনা কোম্পানিটির মূল্য বর্তমানে প্রায় ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও তিনি সক্রিয়। ওপেনএইআইয়ের প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের একজন ছিলেন মাস্ক। পরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে গিয়ে ২০২৩ সালে এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন। তার ভাষায়, এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হলো ‘মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা’। ২০২৪ সালে তিনি ওপেনএইআই ও এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করলেও ২০২৬ সালের মে মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি জুরি সেই মামলা খারিজ করে দেয়।

মাস্ককে নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন করেছেন। সাংবাদিক ক্রিস স্টকেল ওয়াকার বলেছেন, তিনি কখনোই নিশ্চিত নন যে মাস্ক পরদিন কী করতে চান। অন্যদিকে জীবনীকার অ্যাশলি ভ্যান্স তাকে ‘বিতর্কপ্রবণ সবজান্তা’ ও ‘প্রচুর অহংবোধসম্পন্ন’ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গণমাধ্যমে তাকে কখনো ‘উন্মাদ প্রতিভা’, আবার কখনো ‘এক্সের বড় ট্রোল’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি আলোচিত। তিনবার বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ব্রিটিশ অভিনেত্রী টালুলাহ রাইলির সঙ্গে দুবার বিয়ে ও দুবারই বিচ্ছেদ হয়েছে। নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি খোলামেলা কথা বলেন। ২০২২ সালে টেড-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার ভুলগুলো আলাদাভাবে দেখলে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ মনে হতে পারে, তবে তিনি বিশ্বাস করেন তার ইতিবাচক অবদানগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি।

ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরেই তিনি অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হন। সম্পদের দিক থেকে তিনি গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজ ও সের্গেই ব্রিন, ওরাকলের ল্যারি এলিসন, অ্যামাজনের জেফ বেজোস এবং মেটার মার্ক জাকারবার্গের চেয়েও এগিয়ে রয়েছেন।

স্পেসএক্স পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পর তার সম্পদ আরও বৃদ্ধি পায়। ব্লুমবার্গ ও ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে তার নিট সম্পদ এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ব্লুমবার্গের হিসাবে তার সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ডলার। যদিও এই সম্পদের বড় অংশ স্পেসএক্সের শেয়ারের সঙ্গে যুক্ত, ফলে বাজার পরিস্থিতির ওপর তার সম্পদের পরিমাণ নির্ভরশীল।

রাজনৈতিকভাবে মাস্ক দীর্ঘদিন নিজেকে মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচয় দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেন তিনি। পরবর্তীতে সরকারি ব্যয় কমানোর একটি উদ্যোগে দায়িত্ব পেলেও কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুজনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। যদিও পরে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানা যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে মাস্ক ১৪ সন্তানের জনক। প্রথম স্ত্রী, সংগীতশিল্পী গ্রাইমস, নিউরোলিংক নির্বাহী শিভন জিলিস এবং ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাশলি সেইন্ট ক্লেয়ারের সঙ্গে তার সন্তান রয়েছে।

প্রযুক্তি, মহাকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যবসা ও রাজনীতি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন ইলন মাস্ক। বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার মাধ্যমে তিনি শুধু সম্পদের নতুন রেকর্ডই গড়েননি, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা যুগের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন।

ইএইচপি

ট্যাগ: এক্স স্টারলিংক ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলন মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্পেসএক্স টেসলা ফোর্বস Elon Musk জেফ বেজোস বিশ্ব অর্থনীতি প্রযুক্তি সংবাদ ব্যবসা সংবাদ ওপেনএআই Artificial Intelligence Donald Trump মহাকাশ গবেষণা স্যাম অল্টম্যান বৈদ্যুতিক গাড়ি মহাকাশ প্রযুক্তি বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক সম্পদ Elon Musk Net Worth বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি SpaceX Tesla Twitter X Platform Starlink গ্রক Grok xAI OpenAI Sam Altman Forbes Bloomberg টেক উদ্যোক্তা ধনকুবের মার্ক জাকারবার্গ Jeff Bezos Larry Page Sergey Brin ল্যারি পেইজ সের্গেই ব্রিন টেসলা শেয়ার স্পেসএক্স শেয়ার ইলন মাস্ক জীবনী ইলন মাস্কের সন্তান ইলন মাস্ক রাজনীতি ইলন মাস্ক ট্রাম্প বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকা ট্রিলিয়ন ডলার নিট সম্পদ ধনীদের র‌্যাঙ্কিং টেকনোলজি নিউজ ব্যবসা ও বিনিয়োগ EV Industry Global Billionaires Tech Billionaire World Richest Person Elon Musk Biography Elon Musk News Elon Musk Wealth Trillion Dollar Net Worth SpaceX IPO Tesla CEO Tech Industry Innovation Future Technology

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত