ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

‘বাংলাদেশ ২.০’ ছায়া বাজেট ঘোষণা করল এনসিপি

২০২৬ জুন ০৫ ১৮:৫৩:০০

‘বাংলাদেশ ২.০’ ছায়া বাজেট ঘোষণা করল এনসিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ‘বাংলাদেশ ২.০: সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক ছায়া বাজেট প্রকাশ করেছে। দলটির মতে, জনকল্যাণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই এ বাজেটের প্রধান উদ্দেশ্য। এতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ছায়া বাজেট উপস্থাপন করেন দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। এ সময় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি। তবে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে এবং পরবর্তী অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক মানোন্নয়ন তহবিল এবং ৫ হাজার বেসরকারি স্কুল জাতীয়করণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এসএমই ঋণ, যুব উদ্যোক্তা তহবিল এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে।

ছায়া বাজেটে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে প্রথম বছরে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। এজন্য বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, টিআইএন-এনআইডি-ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংযুক্তকরণ, সম্পদ কর চালু, বন্দর ডিজিটালাইজেশন এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিলসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ থেকে অতিরিক্ত ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

কর কাঠামোয় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। নারী ও প্রবীণদের ক্ষেত্রে এটি ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে জাকাতকে আয়কর রিবেট হিসেবে স্বীকৃতি, উত্তরাধিকার কর চালু এবং করপোরেট কর ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে ২৫ শতাংশ বাজেট বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা, দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি, ময়মনসিংহ ও বরিশালে আন্তর্জাতিক মানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ৫০০টি জিপিএস-ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি খাতে আধুনিক শস্য বিক্রয় কেন্দ্র, সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে সার ভর্তুকি প্রদান এবং ফসল সংরক্ষণ অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশ খাতে ‘সোলার এনার্জি সোভারেনটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় সৌর পণ্যের ওপর আগামী পাঁচ বছর শূন্য শতাংশ কর, ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে এক বছরে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ৩ হাজার অফ-গ্রিড গ্রামে সৌর মিনি-গ্রিড স্থাপন এবং ৫০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

নারী ও যুব উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার নারী উদ্যোক্তা তহবিল, স্যানিটারি ন্যাপকিনে শূন্য ভ্যাট, ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতদের সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কারে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন, ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ এবং পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, দেশীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং পোর্টাল, গোপন সম্পদের ওপর বিশেষ কর এবং স্বাধীন বাজেট অফিস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা বলেন, তাদের ৭১ দফা সংস্কার প্রস্তাব কেবল একটি বিকল্প বাজেট নয়; বরং দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগবান্ধব ‘বাংলাদেশ ২.০’ গঠনের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত