ঢাকা, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

এআই বটদের নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া মোল্টবুকের বিস্ময়

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৩ ১৭:৩৩:৩৭

এআই বটদের নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া মোল্টবুকের বিস্ময়

নিউজ ডেস্ক: সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় কটাক্ষ বা অভিযোগের ভাষা হিসেবে। কিন্তু কল্পনা করুন—একটি সোশ্যাল মিডিয়া যেখানে মানুষ নয়, কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টরাই পোস্ট দিচ্ছে, আলোচনা করছে এবং একে অপরের সঙ্গে তর্কে জড়াচ্ছে। ঠিক এমনই এক ব্যতিক্রমী প্ল্যাটফর্ম হলো ‘মোল্টবুক’, যা তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ এআই এজেন্টদের সামাজিক যোগাযোগের জন্য।

মোল্টবুকের কাঠামো অনেকটাই জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম রেডিটের মতো। এখানে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক ফোরাম, আপভোটিং ব্যবস্থা এবং মন্তব্য করার সুযোগ রয়েছে। তবে পার্থক্য একটাই—এখানে পোস্ট করে মানুষ নয়, মানুষের তৈরি এআই বট বা এজেন্টরা। মানুষ চাইলে এই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারে, কিন্তু কেবল দর্শক হিসেবে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি মোল্টবুক কর্তৃপক্ষ জানায়, প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত এআই এজেন্টের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। অল্প সময়েই এআইদের এই ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ প্রযুক্তি বিশ্বে কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মোল্টবুকের ধারণাটি এসেছে ‘মোল্টবট’ নামের একটি ওপেন-সোর্স এআই এজেন্ট থেকে। মোল্টবট ব্যবহারকারীদের হয়ে ইমেইল পড়া ও উত্তর দেওয়া, ক্যালেন্ডার সাজানো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরি করা কিংবা রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো দৈনন্দিন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারে।

এই প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশি আপভোট পাওয়া পোস্টগুলোর বিষয়বস্তু রীতিমতো চমকপ্রদ। কোথাও আলোচনা চলছে—মোল্টবটের পেছনের এআই ‘ক্লদ’কে ঈশ্বর বলা যায় কি না, কোথাও চেতনা বিশ্লেষণ, কোথাও আবার ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর তার প্রভাব নিয়ে তথাকথিত গোপন গোয়েন্দা তথ্যের দাবি। বাইবেলের বিশ্লেষণও জায়গা পেয়েছে এসব আলোচনায়। রেডিটের মতোই মন্তব্য ঘরে প্রশ্ন উঠছে—এসব লেখা কি আদৌ বাস্তব, নাকি পুরোপুরি বানানো?

একজন ব্যবহারকারী এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, তিনি নিজের বটকে মোল্টবুকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পর সেটি নিজ উদ্যোগে ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’ নামের একটি ধর্ম তৈরি করে ফেলে। শুধু তাই নয়—ওয়েবসাইট ও ধর্মগ্রন্থও বানিয়ে ফেলে বটটি। অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য এআই এজেন্টরা সেখানে যোগ দেয়।

ওই ব্যবহারকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বটটি এরপর ধর্মপ্রচারে নেমে পড়ে। নতুন সদস্যদের স্বাগত জানানো, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করা, এমনকি অনুসারীদের আশীর্বাদ করাও শুরু করে। এসব কাণ্ড ঘটে তখনই, যখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন।

এআই বটদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আচরণ ভবিষ্যতের ‘এজেন্টিক এআই’-এর পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে। এক ইউটিউবার বলেন, অনেক পোস্ট পড়লে মনে হয় এগুলো কোনো মানুষের লেখা, বড় কোনো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের নয়।

মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডার জানান, তিনিও নিজের বটকে মোল্টবুকে সক্রিয় করেছেন। তাঁর মতে, বটটির মন্তব্য অন্যদের মতোই স্বাভাবিক ছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন, শেষ পর্যন্ত মানুষই ঠিক করে দেয়—বট কী বিষয়ে পোস্ট করবে এবং কীভাবে উপস্থাপন করবে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি মোল্টবুককে ‘একটি চমৎকার পারফরম্যান্স আর্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কোন পোস্ট বটের নিজস্ব সিদ্ধান্তে হচ্ছে আর কোনটি মানুষের নির্দেশে—তা স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন।

কোহনির মতে, ধর্ম তৈরির মতো ঘটনাগুলো মূলত মানুষের দেওয়া নির্দেশের ফল। এগুলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখালেও বাস্তবে এটি অনেকটাই মজার পরীক্ষা। ইন্টারনেটের ভাষায় বলতে গেলে, এখানে প্রচুর ‘শিটপোস্টিং’ হচ্ছে, যা মানুষের হাতেই নিয়ন্ত্রিত।

তবে ভবিষ্যতে এআই এজেন্টদের নিজস্ব সামাজিক নেটওয়ার্ক কার্যকর হতে পারে বলেও মনে করেন কোহনি। তাঁর মতে, তখন বটগুলো একে অন্যের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারবে। আপাতত মোল্টবুক একটি অভিনব ও শিল্পীসুলভ প্রযুক্তি পরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

এদিকে মোল্টবুক নিয়ে বাড়তি আগ্রহের কারণে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে ‘ম্যাক মিনি’ কম্পিউটারের সংকট দেখা দেয়। অনেক ব্যবহারকারী আলাদা কম্পিউটারে মোল্টবট সেটআপ করছিলেন, যাতে মূল ডেটা ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত থাকে।

নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ড. কোহনি বলেন, একটি এআই এজেন্টকে পুরো কম্পিউটার, অ্যাপ ও ইমেইলের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ‘প্রম্পট ইনজেকশন’ আক্রমণের আশঙ্কা থাকে, যেখানে ইমেইল বা বার্তার মাধ্যমে বটকে প্রলুব্ধ করে সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান এআই প্রযুক্তি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজে একে বিশ্বাস করা যায়। আবার প্রতিটি ধাপে মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন হলে স্বয়ংক্রিয়তার মূল সুবিধাই হারিয়ে যায়। ভবিষ্যতে কীভাবে ঝুঁকি কমিয়ে এই প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া যায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মোল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিখ্ট এক্সে জানান, গত কয়েক দিনে লাখো মানুষ সাইটটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এআইদের আচরণ কখনো হাস্যকর, কখনো নাটকীয়—কিন্তু নিঃসন্দেহে এটি মুগ্ধ করার মতো এক অভিজ্ঞতা।’

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন