ঢাকা, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০ মাঘ ১৪৩২

শবেবরাত: আত্মার নীরব ডাক ও বিবেকের পুনর্জাগরণ

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০২ ১৬:৫৮:২৭

শবেবরাত: আত্মার নীরব ডাক ও বিবেকের পুনর্জাগরণ

ডুয়া ডেস্ক: ইসলামী ক্যালেন্ডারে কিছু রাত আসে, যা শুধু সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়ের সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই রাতগুলো মানুষের আত্মাকে থামিয়ে দেয়, অন্তরের গভীর প্রশ্ন জাগায় এবং বিবেককে জাগ্রত করে। শবেবরাত এমনই একটি রাত। শাবান মাসের মধ্যরাতে যখন পৃথিবীর শব্দগুলো বিশ্রামে, আকাশের নীরবতায় মানুষের অন্তর যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

শবেবরাত হলো সেই রাত, যেখানে ক্ষমার অপেক্ষায় থাকা হৃদয়গুলো দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ ভুল স্বীকার করতে জানে, কেউ বুঝতে শেখে যে পথ হারিয়েছে, আবার কেউ উপলব্ধি করে ফিরে যাওয়ার পথ এখনও বন্ধ হয়নি। ‘বরাত’ শব্দের অর্থই মুক্তি, অব্যাহতি, নতুন করে শুরুর অনুমতি। এই অর্থেই শবেবরাত মানুষের সামনে অতীতের হিসাব রাখে দোষ স্বীকার, সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা, আত্মপরিবর্তনের প্রস্তুতি।

কুরআনের ভাষায় এই রাত বরকতময়। এখানে সতর্কবার্তা নাজিল হয়, সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়, অদৃশ্য হিসাব লেখা হয়। বহু মুফাসসিরের মতে, মানুষের জীবনের গতি, রিজিকের পথ, সময়ের বাঁক জ্ঞান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এটি মানুষকে অহংকারহীন করে কারণ সে বুঝতে পারে, নিয়ন্ত্রণ সীমিত, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা অসীম।

রাসুলুল্লাহ সা.-এর বাণীতে এই রাতের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। আল্লাহ তাআলা এই রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমার দরজা খুলে দেন। তবে বিদ্বেষপূর্ণ অন্তর এবং অহংকারে মোড়া হৃদয় এই করুণার স্বাদ থেকে নিজে বঞ্চিত হয়। শবেবরাত কেবল ইবাদতের রাত নয়; এটি সম্পর্ক ঠিক করার, অন্তর পরিশুদ্ধ করার রাত।

ইমাম গাজ্জালী এটিকে আত্মসমালোচনার আয়না হিসেবে দেখেছেন। নিজের ভাঙন না দেখলে কেউ নির্মাণের পথে হাঁটতে পারে না। ইমাম ইবনু তাইমিয়া বলেছেন, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এই রাতে সেই ব্যক্তির ওপর বর্ষিত হয়, যিনি অন্তর শুদ্ধ করতে চেষ্টা করেন।

সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের জীবনে শবেবরাত কোনো উৎসব ছিল না। ছিল না আলোকসজ্জা বা উল্লসিত আয়োজন। ছিল নিঃশব্দতা, দীর্ঘ সিজদা, নিজের সঙ্গে হিসাব-নিকাশ। তাঁদের কাছে রাতের অর্থ আমি কে ছিলাম, আমি কী হয়ে গেছি, আমি কী হতে চাই।

শবেবরাত শেখায়, আমল সংখ্যা নয়, গভীরতার বিষয়। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তিগফার ও দোয়া তখনই অর্থবহ, যখন তা অন্তরের অনুশোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়। ক্ষমা চাওয়ার আগে ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি না হলে রাতটি অপূর্ণ থেকে যায়।

এ রাত মানুষকে সংযমও শেখায়। অপচয়, বাহুল্য, লোকদেখানো ধর্মীয় আচরণ এসব শবেবরাতের নীরব ভাষার সঙ্গে যায় না। আলেমদের মতে, যে আমল অন্তরকে ভারী করে, আলো নয়, তা রাতের প্রকৃত শিক্ষা বহন করে না।

শবেবরাত মানুষের জন্য বিরল সুযোগ থেমে ভাবার, আত্মাকে জিজ্ঞাসা করার। ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে, সম্পর্কের ক্লান্তিতে, আত্মিক শূন্যতায় এই রাত প্রশ্ন করে তুমি কি ফিরে আসতে চাও? তোমার ভেতরের মানুষটি কি বেঁচে আছে?

এই রাত সাহস দেয় ভুল স্বীকারের, ক্ষমা চাওয়ার, আবার শুরু করার। আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে মূল্যবান কোনো নিখুঁত আমল নয় বরং ভাঙা অন্তর, নত মাথা, সত্যিকারের প্রত্যাবর্তন।

শবেবরাত কেবল রাত নয়। এটি আত্মার নীরব ডাক, বিবেকের পুনর্জাগরণ, এবং মানুষের অন্তরের মানুষটিকে আবার খুঁজে পাওয়ার এক অনাবিল মুহূর্ত।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন