ঢাকা, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২

বিয়ের পাত্রী কেনা-বেচা হয় যে হাটে

২০২৬ জানুয়ারি ০৯ ১৬:৩৮:৪০

বিয়ের পাত্রী কেনা-বেচা হয় যে হাটে

ডুয়া ডেস্ক: বাংলা সমাজে বিয়ের শুরুটা সাধারণত পাত্র-পাত্রী দেখার মধ্য দিয়েই হয়। পছন্দ হলে প্রস্তাব, এরপর কথাবার্তা আর সব ঠিক থাকলে বিয়ের দিনক্ষণ। কিন্তু ইউরোপের একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও প্রচলিত রয়েছে এমন এক রীতি, যেখানে বিয়ে ঠিক হয় প্রকাশ্য এক ‘হাটে’, আর সেখানে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত হয় দাম।

এই প্রথায় বিবাহযোগ্য মেয়েদের একটি নির্দিষ্ট দিনে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে আসা হয় বিশেষ এক স্থানে। সেখানে উপস্থিত হন বিয়ের উপযুক্ত পুরুষরা পাত্র বাছাই নয়, যেন পণ্য নির্বাচন। পছন্দ হলে দরদাম ঠিক হয়, এরপরই বিয়ের সিদ্ধান্ত। মেয়েদের গায়ের রং, সৌন্দর্য ও সতীত্ব এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বয়সসীমা শুরু হয় প্রায় ১২ বছর থেকে, চলে ২৫ পর্যন্ত।

এই বিতর্কিত রীতিটি চালু রয়েছে বুলগেরিয়ার রোমা বা রোমানি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। বহু সংস্কার ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি তাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই ‘কালাাইজ্জি ব্রাইড মার্কেট’ নামে পরিচিত বিয়ের হাট। এখানে কনে পক্ষ তাদের মেয়েদের সম্ভাব্য পাত্রদের সামনে উপস্থাপন করে। পাত্রপক্ষ কথা বলে, যাচাই করে এবং শেষে দেনমোহর বা অর্থের অঙ্ক ঠিক করে সিদ্ধান্ত নেয়।

বুলগেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু রোমা বসতিতে উৎসবের সময় এই আয়োজন বসে। মেয়েরা সেদিন বিশেষভাবে সাজগোজ করে পরিবারের সঙ্গে হাজির হন। পাত্রপক্ষ মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শোনে এবং অনেক ক্ষেত্রেই একই দিনে বিয়ের আর্থিক শর্ত নির্ধারিত হয়ে যায়। ফলে এই বিয়ে সামাজিক বন্ধনের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক চুক্তিতেও রূপ নেয়।

ইউরোপে রোমা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধার অভাব তাদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করেছে। এ কারণে অনেক পরিবার মনে করে, এই বিয়ের হাট মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও দ্রুত ‘উপযুক্ত পাত্র’ খুঁজে পাওয়ার কার্যকর উপায়। আগেভাগেই বিয়ের খরচ নির্ধারিত থাকায় তারা একে স্বচ্ছ ব্যবস্থাও মনে করে।

তবে আধুনিক সমাজে এই প্রথা তীব্র সমালোচনার মুখে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এখানে অনেক সময় মেয়েদের মতামত উপেক্ষিত হয়। অর্থের বিনিময়ে বিয়ে ঠিক হওয়ায় এটি নারীদের পণ্য হিসেবে দেখার শামিল। পাশাপাশি কম বয়সে বিয়ে, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।

আইন অনুযায়ী বুলগেরিয়ায় বিয়ের নির্দিষ্ট বয়সসীমা থাকলেও, রোমা সমাজের বহু বিয়ে সামাজিক রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধিত হয় না। এতে আইনগত নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।

তবে পরিবর্তনের হাওয়া পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। রোমা সমাজের নতুন প্রজন্মের অনেকেই শিক্ষা ও কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তারা পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে, নারীর সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান এবং অর্থের বিনিময়ে সম্পর্ক নির্ধারণের রীতি থেকে সরে আসতে চান। যদিও সমাজের একটি অংশ এখনো এই প্রথাকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে।

এই বিয়ের হাটে অংশ নেওয়া মেয়েদের অভিজ্ঞতাও এক নয়। কেউ এটিকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যতের সুযোগ মনে করেন, আবার কারও কাছে এটি পারিবারিক ও সামাজিক চাপের প্রতিফলন। ফলে এই প্রথা নিয়ে বাস্তবতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন।

সব মিলিয়ে রোমা সম্প্রদায়ের এই বিয়ের হাট একদিকে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্যদিকে আধুনিক মূল্যবোধ ও নারী অধিকারের সঙ্গে সংঘাতের চিত্র। সময়, শিক্ষা ও সচেতনতার অগ্রগতির সঙ্গে এই প্রথা কীভাবে বদলায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত