ঢাকা, বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

অডিট রিপোর্টে হাজারো গরমিল: তবুও মিলছে ব্যাংক ঋণ, বাড়ছে ডিফল্টার

২০২৬ জানুয়ারি ০৪ ১৩:২৮:৪৫

অডিট রিপোর্টে হাজারো গরমিল: তবুও মিলছে ব্যাংক ঋণ, বাড়ছে ডিফল্টার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের করপোরেট খাতে আর্থিক স্বচ্ছতার বড় সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্টে গুরুতর অনিয়ম ও তথ্যের অসামঞ্জস্য ধরা পড়লেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অডিট সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদাসীনতাই ব্যাংকিং খাতে বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ জমে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত—দুই ধরনের কোম্পানিই ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

বিশ্বখ্যাত অডিট প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট-এর স্থানীয় পার্টনার এস কে আশিক ইকবাল বলেন, অডিটরদের পর্যবেক্ষণ ও আপত্তিকে শেয়ারহোল্ডার কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কেউই গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিবেদনে অসংখ্য ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো অনায়াসেই ব্যাংক ঋণ পাচ্ছে। এমনকি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি বার্ষিক সাধারণ সভায় নির্বিঘ্নে অডিট রিপোর্ট অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছে।

নিরীক্ষকদের মতে, তাদের দায়িত্ব হলো কোম্পানির হিসাবপত্রে গোপন দায়, অতিমূল্যায়িত সম্পদ কিংবা লেনদেনের প্রমাণহীনতা শনাক্ত করা। কিন্তু বাস্তবে অডিট কার্যক্রম এখন অনেকাংশেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। আশিক ইকবাল বলেন, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের সহযোগিতা না থাকায় অডিটরদের ভূমিকা এখন কেবল চেকলিস্ট পূরণের মধ্যে আটকে যাচ্ছে।

এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনার্সের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সুলতান মাহমুদ জানান, অনেক কোম্পানি জমির মালিকানা বা নামজারির নির্ভরযোগ্য কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। এসব ক্ষেত্রে অডিট রিপোর্টে ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী অডিট কমিটির উচিত এসব অনিয়ম বোর্ডের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে অডিট কমিটি নীরব থাকে—কিছু কোম্পানিতে তো অডিট কমিটিই নেই।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মনে করেন, অডিটরদের আপত্তিকে কার্যকর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। তার মতে, ভুয়া তথ্য দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে বিদেশে ডিভিডেন্ড পাঠানোর বিষয়েও কড়াকড়ি আরোপ সম্ভব।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলো নিজস্ব ঋণনীতির ভিত্তিতে ঋণ দেয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে না। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলো যদি অডিট রিপোর্টকে যথাযথ গুরুত্ব দিত, তাহলে ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন’ থাকা কোম্পানিগুলো এত সহজে ঋণ পেয়ে খেলাপিতে পরিণত হতে পারত না।

উদ্বেগজনকভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই অনিয়মের বাইরে নয়। উদাহরণ হিসেবে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-এর ২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, ডিপিডিসি থেকে নেওয়া ৩.৫৯ বিলিয়ন টাকার ঋণের কোনো গ্রহণযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। আশ্চর্যের বিষয়, ডিপিডিসি-র অডিট রিপোর্টেও এই অংকের উল্লেখ নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নিরীক্ষক জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি হারানোর ঝুঁকি না থাকায় কর্মকর্তারা অডিট আপত্তিকে গুরুত্ব দেন না।

এমজে/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত