ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় ১৭ দফা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ জুলাই ০৮ ১৬:৩৩:১০

শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় ১৭ দফা পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনে ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারীর পক্ষে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের প্রধান কারণ কী ছিল এবং এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অনুসন্ধানে কয়েকজন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কেলেঙ্কারির সঙ্গে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত আছে কি না, তা উদঘাটনের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

তিনি জানান, বিগত সরকারের আমলে শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক পতনের কারণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ, বিনিয়োগকারী সংগঠন এবং বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা কাজ করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণে বাজার কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো-কমানো, কিছু কোম্পানির আইপিও, বন্ড ও অন্যান্য ইস্যুতে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বল তদারকি এবং সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ, বাজারে আস্থার সংকট, নীতিগত অসঙ্গতি, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা এবং পুঁজিবাজারবান্ধব করনীতির অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শেয়ারবাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোট ১ হাজার ৪৯৭ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করেছে। পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্য অর্জনে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে একটি উন্নত ও টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের গৃহীত অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-

১. বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার ৪ জুন পুঁজিবাজার বিষয়ে দক্ষ এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনারকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে।

২. নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাজারে বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করেছে।

৩. লাভজনক সরকারি মালিকাধীন কোম্পানিসমূহের শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণে উদ্বুদ্ধ করা। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিসহ উচ্চ মূলধনসম্পন্ন কোম্পানিসমূহের শেয়ারও স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তিকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা।

৪. এসএমই কোম্পানিসহ ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিসমূহকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা।

৫. পুঁজিবাজার কারসাজি বন্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ ও প্রদানকারীর প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া।

৬. তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের হিসাব নিরীক্ষা, উপর্যুক্ত অডিটরের মাধ্যমে নিরীক্ষার নিমিত্ত নিরীক্ষক ও নিরীক্ষা সংস্থাগুলির প্যানেলে তালিকাভুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন করা।

৭. বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) অনবোর্ডিং পোর্টাল চালু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান সংস্কার, ওয়ান স্টপ সিকিউরিটিজ কাস্টডিয়ান সার্ভিস চালু, ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স হ্রাসকরণ, লভ্যাংশ আয়ে দ্বৈত কর বাতিল এবং বিও অ্যাকাউন্ট খোলা ও মূলধন প্রত্যাবসান প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা।

৮. পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা দায়ের সংক্রান্ত বিধান সিকিউরিটিজ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা।

৯. পুঁজিবাজারের সংস্কারকল্পে একটি ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করা।

১০. পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কেট ও পণ্য উভয়ই সম্প্রসারিত করা।

১১. ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে অনলাইন ও মোবাইল ভিত্তিক বিও হিসাব খোলা ও ট্রেডিং সুবিধা চালু করা।

১২. বিনিয়োগবান্ধব ও যুক্তিসঙ্গত করনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া।

১৩. ব্যাংক ও এমএফএস এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া।

১৪. এআইভিত্তিক শক্তিশালী নজরদারির মাধ্যমে বাজারের অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রাখা।

১৫. তালিকাভুক্ত ইস্যুয়ার কোম্পানিসমূহে সুশাসন জোরদারকরণে সমন্বিত গ্রাহক হিসাবে অর্জিত সুদ আয়ের অংশ বিশেষ বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে জমা করার বিধান প্রণয়ন করা।

১৬. আইনকানুন যুগোপযোগী করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ আরও সুরক্ষিত করা।

১৭. সরকারি সিকিউরিটিজসমূহের (ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও সরকারি সুকুক) লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে নিষ্পন্ন করার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা ইত্যাদি।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত