ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২

অনিয়ম প্রমাণিত, এলআর গ্লোবালের লাইসেন্স বাতিলে এগোচ্ছে বিএসইসি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৪ ১৫:৫৪:২৫

অনিয়ম প্রমাণিত, এলআর গ্লোবালের লাইসেন্স বাতিলে এগোচ্ছে বিএসইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারের মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড-কে তাদের পরিচালিত ছয়টি মিউচুয়াল ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কমিশন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ফান্ড পরিচালনায় গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, বিনিয়োগ বিধি লঙ্ঘন, স্বার্থসংঘাত এবং ইউনিটহোল্ডারদের আর্থিক ক্ষতির ঘটনা। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কমিশন জনস্বার্থে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়।

এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে থাকা ফান্ডগুলো হলো: ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড-১, এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড-১ এবং এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রিয়াজ ইসলাম। উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত আছেন ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও ক্রীড়া সাংবাদিক রেজাউর রহমান সোহাগ।

বিএসইসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ তাদের অধীন ছয়টি ফান্ড থেকে পদ্মা প্রিন্টার্স অ্যান্ড কালার লিমিটেড (বর্তমানে কোয়েস্ট বিডিসি পিএলসি)-এর ৫১ শতাংশ শেয়ার কেনায় বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে। শুরুতে প্রায় ২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে ৪৫ কোটির বেশি টাকা শেয়ারমানি হিসেবে দেওয়া হয়, যা পরে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তরিত হয়। কমিশনের মতে, ভূমি মূল্যায়ন সম্পন্নের আগেই এই বিনিয়োগ করা হয়।

বিনিয়োগের সময় কোম্পানিটির কার্যক্রম স্থবির ছিল, আর্থিক সূচক ছিল নেতিবাচক এবং বাজারে শেয়ারের লেনদেন মূল্য ছিল ১৩ টাকার সামান্য বেশি। অথচ প্রায় ২৮৯ টাকা দরে উল্লেখযোগ্য প্রিমিয়ামে শেয়ার কেনা হয়। কমিশনের মতে, এটি মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০০১-এর বিধি ৫৬ লঙ্ঘনের পাশাপাশি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থবিরোধী।

এছাড়া কমিশনের অনুমোদনে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে শেয়ার ইস্যুর সম্মতি থাকলেও এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ ১৫.৮৮ টাকা দরে শেয়ার কেনে। একই সময়ে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এলআরজি ভেঞ্চার লিমিটেড একই শেয়ার ১০ টাকায় সংগ্রহ করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এলআরজি ভেঞ্চারের লভ্যাংশ এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ পাবে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর ইউনিটহোল্ডাররা সে সুবিধা পাবেন না। কমিশন একে দ্বৈত নীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বিধি ৩৩(১) লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।

কমিশনের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোনো একক ফান্ড থেকে একক কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ১৫ শতাংশের বেশি শেয়ার অধিগ্রহণ করায় বিনিয়োগে বাধা-নিষেধ সংক্রান্ত পঞ্চম তফসিলের শর্ত ৩ লঙ্ঘন হয়েছে বলেও জানায় বিএসইসি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কোয়েস্ট বিডিসির শেয়ার উচ্চমূল্যে কেনার ফলে ইউনিটহোল্ডাররা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যা বিধি ৩৩(৭) অনুযায়ী দায়িত্বে চরম ব্যর্থতা।

আইন লঙ্ঘন করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরিফ আহসানকে এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ডের পক্ষ থেকে কোয়েস্ট বিডিসির পরিচালক মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং তাকে মাসিক ৩ লাখ টাকা বেতনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করা হয়। একই সময়ে তিনি সোনালী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের এমডি/সিইও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কমিশন বলছে, এটি বিধি ১৩ লঙ্ঘন।

শেয়ার কেনার পর কোয়েস্ট বিডিসির পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত হওয়াও সম্পদ ব্যবস্থাপকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না এবং এ বিষয়ে ট্রাস্টি ও কমিশনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি—যা বিধি ৩২(খ) লঙ্ঘন।

২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কোয়েস্ট বিডিসিতে বিনিয়োগ থেকে কোনো মুনাফা পায়নি সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলো। উপরন্তু কোম্পানিটি ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত হওয়ায় শেয়ার বিক্রির সুযোগ সীমিত। যেহেতু ফান্ডগুলো ক্লোজড-এন্ড, মেয়াদ শেষে এসব শেয়ার বিক্রি জটিল হয়ে পড়বে—ফলে ইউনিটহোল্ডারদের সম্ভাব্য ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে কমিশন।

এসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে বিএসইসি মনে করছে, সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহিতায় ব্যর্থ হয়েছে। তাই জনস্বার্থে তাদের নিয়োগ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টিদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন বাতিলের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে রিয়াজ ইসলাম ও সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম-কে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে রিয়াজ ইসলামসহ পাঁচ পরিচালক ও ট্রাস্টির বিরুদ্ধে মোট ১০৯ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয় এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এএসএম/

শেয়ারবাজারের বিশ্লেষণ ও ইনসাইড স্টোরি পেতে আমাদের পেজ ফলো করুন।

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত