ঢাকা, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২

অ-স্ত্র রপ্তানির টাকায় ঋণচক্র ভাঙার স্বপ্ন ইসলামাবাদের

২০২৬ জানুয়ারি ০৮ ১৪:৩২:৩৪

অ-স্ত্র রপ্তানির টাকায় ঋণচক্র ভাঙার স্বপ্ন ইসলামাবাদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘদিনের ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার এক ভিন্ন পথের কথা সামনে এনেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দাবি করেছেন, যুদ্ধবিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান রপ্তানি থেকে আসা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ধারাবাহিক বেইলআউট কর্মসূচির বাইরে বের করে আনতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি দেশের সঙ্গে চলমান ও চূড়ান্ত চুক্তি মিলিয়ে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য আয় সামনে রয়েছে।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের ‘ক্যাপিটাল টক’ অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হামিদ মীরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, লিবিয়া, আজারবাইজান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ পাকিস্তানে নির্মিত জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান এবং সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে। এসব অর্ডার বাস্তবায়িত হলে তা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরু পর্যন্ত সময়কে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এক ব্যতিক্রমী সময় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক বড় চুক্তির কারণে সামরিক রপ্তানিতে নতুন গতি এসেছে। সরকারি মহলের মতে, এই বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ আইএমএফের কঠোর শর্তযুক্ত ঋণের বিকল্প হতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতিতে প্রভাব ফেলেছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, পাকিস্তানকে বারবার আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিতে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশটি ৭ বিলিয়ন ডলারের এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি পায়। পরে ২০২৫ সালের মে মাসে জলবায়ু সহনশীলতা তহবিল থেকে আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদিত হয়। তবে প্রতিরক্ষা রপ্তানির সম্ভাব্য আয় সামনে আসায় ইসলামাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।

এই আশাবাদের বড় ভিত্তি আজারবাইজানের সঙ্গে করা ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি। এর আওতায় দেশটি ৪০টি জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি যুদ্ধবিমান কিনবে, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ একক রপ্তানি চুক্তি। চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান আজারবাইজানের বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ককেশাস অঞ্চলে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানও জোরদার করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে লিবিয়ার সঙ্গে। লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে ১৬টি জেএফ-১৭ জেট, ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান এবং সহায়ক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিকে আরব অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাজার সম্প্রসারণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। দুই দেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জেএফ-১৭ সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিমানবহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ঢাকা যুদ্ধবিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান—উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, যদিও চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

নাইজেরিয়া ইতোমধ্যেই জেএফ-১৭ ব্যবহার করছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিমান কেনার পাশাপাশি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমানের প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছে। খাজা আসিফের উল্লেখ করা ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য অঙ্কে এসব চলমান আলোচনা ও চুক্তির হিসাব যুক্ত রয়েছে। সুপার মুশাক ইতোমধ্যে তুরস্কে ৫২টি সরবরাহসহ বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যা বড় যুদ্ধবিমান কেনার পথে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের পুরোনো সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হবে। অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় এই আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা খাত থেকে আসা এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সময়মতো সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে যেসব দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির।

খাজা আসিফের বক্তব্য পাকিস্তানে স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে। ২০২৫–২৬ সালের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আইএমএফের ওপর নির্ভরতা কমানোর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত