×

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

এস আলমের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল

২০২৬ অক্টোবর ০৯ ১৬:৪৯:২৭

এস আলমের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফার্স্টকমকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে আবারও ব্যবসায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) জারি করা নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর ফলে অতীতে বিভিন্ন অনিয়মে অভিযুক্ত কোম্পানিটি প্রচলিত বাজার শৃঙ্খলা, বিধিবদ্ধ তদারকি ও আর্থিক দায়সংক্রান্ত কাঠামো এড়িয়ে আলাদাভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী। তিনি বলেছেন, বিটিআরসি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির স্বার্থে কাজ করে না এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্যও নির্দেশনা জারি করেনি। প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই গত ৩০ সেপ্টেম্বর আইজিডব্লিউ অপারেটরদের বিষয়ে নির্দেশনাটি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিটিআরসির মহাপরিচালক শফিউল আজম পারভেজ স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক কল লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত আইজিডব্লিউ অপারেটররা কমন ইন্টারন্যাশনাল পয়েন্ট (সিআইপি) পৃথকভাবে ইন্টার অপারেটর এক্সচেঞ্জ (আইওএক্স) সুইচ স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। এত দিন অপারেটররা সম্মিলিতভাবে সিআইপিতে যুক্ত হয়ে সেবা দিয়ে আসছিলেন।

সম্মিলিত ব্যবস্থায় অপারেটরদের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ভাগাভাগি এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা যাচাই করা সহজ ছিল। এ নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল সংশ্লিষ্ট অপারেটরের আগাম ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়া। কোনো অপারেটরের ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক দায় তৈরি হলে সরকার যাতে পাওনা আদায় করতে পারে, সে লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই আইজিডব্লিউ অপারেটরদের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিল ফার্স্টকম। তবে অন্য অপারেটরদের আপত্তির কারণে তাদের সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। অপারেটররা ফার্স্টকমের কাছে তাঁদের বকেয়া প্রায় আড়াই কোটি টাকা পুরোপুরি পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি আগাম ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়া ফার্স্টকমকে সম্মিলিত কমন পয়েন্টে যুক্ত করারও বিরোধিতা করেন অন্য অপারেটররা। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, কোম্পানিটি আবারও কমন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার পর আগের মতো নতুন আর্থিক দায় তৈরি করলে তা আদায় করা কঠিন হবে। এতে পুরো খাতের কার্যক্রমে আবারও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।

আইজিডব্লিউ অপারেটরদের বকেয়া পরিশোধ এবং আগাম ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার শর্ত পূরণ করতে না পারায় ফার্স্টকমের সম্মিলিত কমন পয়েন্টে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়। এর মধ্যেই ৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে বিটিআরসির নতুন নির্দেশনা জারি হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধ না করা এবং বেশ কিছু গুরুতর অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ফার্স্টকমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি।

এরপর ২০২৫ সালের ২৫ মে বিটিআরসির আরেকটি নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ‘৩১ জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে নতুন টপোলজিতে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়।’ অর্থাৎ, নতুন টপোলজিতে যুক্ত হওয়ার জন্য বকেয়া পরিশোধকে সরাসরি শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।

২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর বিটিআরসি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যা আগের নির্দেশনার বিপরীত বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন আইজিডব্লিউ অপারেটরদের পাওনা এবং বিটিআরসির নিজস্ব পাওনা পুরোপুরি আদায় না হলেও ফার্স্টকমের ওপর আরোপ করা ১০০ শতাংশ অপারেশনাল ক্যাপ তুলে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গুরুতর অনিয়মে অভিযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া নিষ্পত্তির আগেই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পক্ষপাতমূলক। এদিকে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ বিটিআরসি প্রকাশিত মিটিং মিনিটস ঘিরেও ফার্স্টকমের বকেয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। ওই কার্যবিবরণীতে ফার্স্টকম, আইজিডব্লিউ অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমঝোতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, সমঝোতার ওই তথ্য ছিল জালিয়াতির ঘটনা।

সংশ্লিষ্ট অপারেটররা দাবি করেন, তাঁদের সঙ্গে এ ধরনের কোনো সমঝোতা হয়নি। বরং তাঁরা বিটিআরসির বিরুদ্ধে মিটিং মিনিটস জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে তীব্র বিতর্কের এক দিন পর, ১৬ মার্চ ২০২৬, ফার্স্টকমকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেয় বিটিআরসি।

প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ফার্স্টকমের ৭৭ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিকানা রয়েছে বিতর্কিত গ্রুপ ও ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত এস আলমের বেনামে। বাকি শেয়ারের মালিক সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও তাঁর পরিবার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর স্পেশাল জজ আদালত এস আলম ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪২টি কোম্পানির অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দেন।

আদালতের ওই ৪২টি কোম্পানির তালিকার ৫ নম্বরে রয়েছে জেনেসিস টেক্সটাইল এবং ৩৯ নম্বরে লায়ন সিকিউরিটিজ কোম্পানি লিমিটেড। এ দুটি প্রতিষ্ঠান ফার্স্টকমের সবচেয়ে বড় শেয়ারমালিক। আদালতের জব্দের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ফার্স্টকম কীভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত