ঢাকা, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

নুসরাত হত্যার সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনা

২০২৬ আগস্ট ২৪ ১৭:৫১:১৫

নুসরাত হত্যার সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাত জাহান রাফির শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে তাঁর মা শিরিনা আক্তার ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির মামলা করেন। সোনাগাজী থানার সেই মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকেই মামলা তুলে নিতে নুসরাত ও তাঁর পরিবারের ওপর নানাভাবে চাপ আসতে থাকে।

ওই বছরের ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে তাঁকে কৌশলে মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে হাত-পা বেঁধে তাঁর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন নুসরাত।

এরপর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত। পরে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল সোনাগাজী থানায় মামলা করলে সেটি পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।

নুসরাত জাহান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার ছাদেই তাঁর শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পরে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। চারজনকে যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয় আগুন

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের জানান, নুসরাত হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের একজন শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০)। তাঁর জবানবন্দি থেকে সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে। শাহাদাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, শরীরে আগুন দেওয়ার দিন আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিতে। পরীক্ষা শুরুর আগে বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে—এমন খবর শুনে ছাদে ছুটে যান নুসরাত। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া পাঁচজন মিলে তাঁকে ধরে ছাদে চিত করে শুইয়ে ফেলেন।

এরপর তাঁর পরনের ওড়নাটি দুই ভাগ করে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এক লিটার কেরোসিন নুসরাতের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢালা হয়। ম্যাচের কাঠি দিয়ে পায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুন যখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ওই পাঁচজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যান।

নেপথ্যে কারণ কী?

২০১৯ সালের ২৭ মার্চ নুসরাতকে কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করলে সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মূলত এ ঘটনার জেরেই নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়া হয়।

মৃত্যুর আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতেও মাদ্রাসাটির তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করেন।

আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনার পর থেকেই নুসরাত খুনিদের লক্ষ্য হন। এরপর থেকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতের পরিবারকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এরপরও প্রতিবাদে অনড় ছিলেন নুসরাত। আগুন ধরিয়ে দেওয়ার আগমুহূর্তেও তাঁকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়, কিন্তু নুসরাত তা মানেননি। পরবর্তী সময় অগ্নিদগ্ধ অবস্থাতেও তিনি প্রতিবাদ করে গেছেন।

নুসরাত হত্যার ঘটনায় দণ্ডপ্রাপ্ত শাহাদাত হোসেন ও নুর উদ্দিন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ১১ ঘণ্টা ধরে ৫৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে তাঁরা ওই দিনের ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন।

এই দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে জড়িত তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন, গ্রেপ্তার হওয়ার পর অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে দেখা করতে যারা কারাগারে গিয়েছিলেন, তাঁদের সবার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন সিরাজ। এরপর তিনি আলাদাভাবে ওই মাদ্রাসার ছাত্র এবং ‘সিরাজ উদদৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক নুর উদ্দিন (২০), যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন ওরফে শামীম (২০) এবং আরেক ছাত্রের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি তাঁদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নুসরাতকে চাপ দিতে বলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শাহাদাতের সঙ্গে একা কথা বলেন। তখন তিনি চাপে কাজ না হলে প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী নুসরাতকে হত্যা করা হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান ওরফে নোমান সোনাগাজী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই বছরের ২৮ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শেষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দেয়। এরপর শুরু হয় মামলার বিচার।

মামলায় ৮৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। ৬১ কার্যদিবসে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রশিদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

ওই রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।

ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল

রায়ে বলা হয়, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। রুহুল আমিন হত্যার পরিকল্পনা জানতেন, এতে অংশ নেন এবং আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। মাকসুদ আলম হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেন, অগ্নিসংযোগ ঘটানোর জন্য ১০ হাজার টাকা দেন এবং হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

নুসরাতকে হাত-পা বেঁধে ছাদে ফেলে মুখ ও মাথা চেপে ধরে কেরোসিন দিয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেন শাহাদাত হোসেন। অগ্নিসংযোগের ঘটনা নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদ্রাসার গেটের ভেতর পাহারায় ছিলেন আবছার উদ্দিন, আবদুল কাদের এবং মো. শামীম।

নুসরাতকে ছাদে ডেকে তাঁর ওড়না খুলে হাত-পা বেঁধে ফ্লোরে ফেলে হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করেন আসামি উম্মে সুলতানা। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরকা ও হাতমোজা সংগ্রহ এবং নুসরাতকে মেঝেতে ফেলে বুক চেপে ধরেন কামরুন নাহার।

হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদ্রাসার গেটের বাইরে পাহারায় ছিলেন ইফতেখার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, আবদুর রহিম এবং ইমরান হোসেন। মো. যোবায়ের ওড়না ছিঁড়ে নুসরাতের পা পেঁচিয়ে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন দেন। অগ্নিসংযোগের ঘটনা নির্বিঘ্ন করার জন্য মাদ্রাসার নিচে পাহারায় ছিলেন মহিউদ্দিন শাকিল। জাবেদ হোসেন নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগের আগে কেরোসিন ঢালেন। মো. শামীম মাদ্রাসার ভেতরে পাহারারত ছিলেন।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৩ আগস্ট)

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ ভরিতে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা... বিস্তারিত