ঢাকা, শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

শাহবাগে বাড়ছে পরিচয়হীন মরদেহ, শনাক্তে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

২০২৬ আগস্ট ২১ ১২:৪২:১০

শাহবাগে বাড়ছে পরিচয়হীন মরদেহ, শনাক্তে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকার শাহবাগ ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ১২ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ রেখে এক ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ার পরও ১৮ আগস্ট পর্যন্ত তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ এবং প্রচার চালিয়েও অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

১২ আগস্ট দুপুরে একটি ট্রলিতে করে ওই কিশোরীকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে আসেন এক ব্যক্তি। নিজেকে কিশোরীর স্বজন পরিচয় দিয়ে তিনি চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার কথা জানান। তবে ট্রলি জরুরি বিভাগের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সময়ই তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান, কিশোরীটি আগেই মারা গেছে।

ঘটনার পর শাহবাগ থানা পুলিশ কিশোরীর পরিচয় ও স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু করে। আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি মরদেহের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউজ পোর্টালে প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলাও করা হয়েছে। এরপরও ১৮ আগস্ট পর্যন্ত তার পরিচয় নিশ্চিত হয়নি।

শুধু ওই কিশোরীই নন, সাম্প্রতিক সময়ে শাহবাগ এলাকায় আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ১৭ আগস্ট জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের ইউটার্নের ফুটপাত থেকে প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের বিপরীতে ফুটওভার ব্রিজের নিচ থেকে আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়। তারও আগে ১২ জুলাই শাহবাগের তিনটি পৃথক স্থান থেকে একই দিনে তিনজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে পুলিশ জানিয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, শাহবাগ থানার আওতাধীন এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, জাতীয় শহীদ মিনার, তিন নেতার মাজার ও গোলাপ শাহ মাজারসহ অনেক খোলা জায়গা রয়েছে। এসব এলাকায় পাওয়া অজ্ঞাতনামা মরদেহের বড় একটি অংশ ভবঘুরে মানুষের। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে দুর্ঘটনায় নিহত বা পরিচয়হীন ব্যক্তিদের মরদেহও ঢামেক হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালটি শাহবাগ থানার আওতাধীন হওয়ায় সেসব মরদেহও এ থানায় নথিভুক্ত হয়।

ঢামেক হাসপাতালের মর্গের দায়িত্বে থাকা লিটন ইসলাম জানান, ১ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ২৪টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ এসেছে। এর আগে জুলাই মাসে এসেছিল অর্ধশতাধিক এমন মরদেহ। এর বেশিরভাগই শাহবাগ থানা এলাকা ও আশপাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন জানান, পরিচয়হীন রোগী ও মরদেহের চিকিৎসা এবং ব্যবস্থাপনায় পুলিশ সহযোগিতা করে। রেল ও সড়ক দুর্ঘটনা, অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়া কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অনেক পরিচয়হীন মানুষ হাসপাতালে আসেন। তাদের কেউ মারা গেলে মরদেহ শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়।

হাসপাতালে অসুস্থ ব্যক্তি বা মরদেহ রেখে স্বজনের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে জানান তিনি। এমন একটি ঘটনায় নরসিংদীর পলাশ থেকে এক ব্যক্তি নিজের ছেলের মরদেহ হাসপাতালে রেখে চলে গিয়েছিলেন। পরে পুলিশ তাকে শনাক্ত করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, অজ্ঞাতনামা মরদেহ প্রথমে সাধারণত শাহবাগ থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্য থানার এলাকায় মরদেহ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট থানাকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপর পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢামেক মর্গে পাঠায়। অনেক সময় দাফনের ঠিক আগে, এমনকি দাফনের পরও স্বজনরা এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।

ঢামেক হাসপাতাল শাহবাগ থানার প্রশাসনিক আওতাভুক্ত হওয়ায় অজ্ঞাতনামা মরদেহ শনাক্তের প্রক্রিয়ায় সমন্বয়ের বড় দায়িত্বও এই থানার ওপর। মর্গকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনের জন্য থানার দুজন উপপরিদর্শক ও দুজন কনস্টেবল দুই ধাপে আট ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করেন।

শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিচয় শনাক্তের জন্য সিআইডি ও পিবিআই নিয়মিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ সংগ্রহ করে। তবে সব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকে না। আবার কোনো কোনো মরদেহের আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায় কিংবা পচনের কারণে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যাচাইয়ের সুযোগ থাকলেও অনেকের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের পরও পরিচয় না মিললে মরদেহের ছবি ও তথ্য দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপরও স্বজনের সন্ধান না মিললে নির্দিষ্ট সময় পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহযোগিতায় মরদেহ দাফন করা হয়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহকে কেবল ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হিসেবে বিবেচনা করলে প্রকৃত ঘটনা আড়ালে থেকে যেতে পারে। এর পেছনে দুর্ঘটনা, অবহেলা কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধের ঘটনাও থাকতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঢামেকে অজ্ঞাতনামা রোগী ও মরদেহের জন্য আলাদা ইউনিট চালু করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো ঘটনায় কাউকে হাসপাতালে আনা হলে বাহক ও রোগীর পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে থাকা বিশেষ চিহ্ন এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করার পরামর্শ দেন তিনি।

তার মতে, কাউকে ভবঘুরে বা অজ্ঞাতনামা হিসেবে রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করার পাশাপাশি প্রতিটি মৃত্যুর কারণও খুঁজে দেখা জরুরি। পরিচয়হীন মানুষকে শুধু একটি সংখ্যা নয়, একজন নাগরিক হিসেবে বিবেচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২১ আগস্ট)

আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২১ আগস্ট)

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন করে বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। ভরিতে ৩ হাজার ৮৪৯ টাকা বাড়িয়ে ভ্যাটসহ... বিস্তারিত