ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

রাকসুর ১৮ লাখ টাকার হিসাব জমা দেননি আম্মার

২০২৬ আগস্ট ২০ ১৩:৫৫:৩১

রাকসুর ১৮ লাখ টাকার হিসাব জমা দেননি আম্মার

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ মাসে ৪২টি কর্মসূচির জন্য রাকসু তহবিল থেকে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল-ভাউচার এখনো জমা দেওয়া হয়নি। রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নথি অনুযায়ী, রাকসুর সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ নিয়েছেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। সাত ধাপে তাঁর নামে মোট ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিন ধাপে নেওয়া ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকার ব্যয়ের কোনো ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি।

এর মধ্যে রয়েছে ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় বুথ স্থাপনের জন্য নেওয়া ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, ২৭ জানুয়ারি রাকসু সংসদ সদস্যদের জানুয়ারি মাসের বাজেট বাবদ নেওয়া ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা এবং ১৩ এপ্রিল রাকসু সদস্যদের দাপ্তরিক খরচের জন্য নেওয়া ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার বুথ বসানোর সময় এটি আমাদের প্রথম দিকের বাজেট ছিল। তখন ব্যয়ের ওপর ভ্যাট যোগ করা হবে, এটা জানা ছিল না। ফলে এই ৩ লাখ টাকার হিসাব সমন্বয় করে বিল করা কিছুটা সমস্যার হয়েছে। সাংসদদের জন্য নেওয়া ওই টাকার মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদকের হিসাব না আসায় সেটি জমা দেওয়া হয়নি। বাকি আরেকটি জমা দেওয়া হয়েছে।’

নথি অনুযায়ী, বিল-ভাউচার জমা না দেওয়া তিনটি কর্মসূচির কার্যক্রম এখনো চলমান। তবে অন্য কয়েকটি কর্মসূচি এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস আগেই শেষ হয়েছে। এ ছাড়া রাকসুর ভিপির দাপ্তরিক খরচ বাবদও সাড়ে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য রয়েছে।

ভিপি ১৩ লাখ টাকা নিয়ে হিসাব দিয়েছেন ৯৯ হাজারের

রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদের নামে ছয় ধাপে মোট ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈদুল আজহার একটি কর্মসূচির ৯৯ হাজার ৯২৪ টাকার ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। বাকি ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার কোনো ভাউচার জমা পড়েনি।

নথি অনুযায়ী, ১৩ এপ্রিল ভিপি দাপ্তরিক খরচ বাবদ দেড় লাখ টাকা নেন। ওই অর্থের হিসাব না দিয়েই ১৯ জুলাই আবার দাপ্তরিক খরচ বাবদ ২ লাখ টাকা নেন। এ ছাড়া ৩ আগস্ট ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখানোর জন্য ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪০০ টাকা, একই দিনে ‘ভিক্টরি রান উইথ রাকসু’ কর্মসূচির জন্য ৩ লাখ টাকা এবং ৬ আগস্ট ‘জুলাই জাদুঘর’ স্থাপনের জন্য ২ লাখ ৮ হাজার টাকা নেওয়া হলেও এসব অর্থের ভাউচার জমা হয়নি।

এ বিষয়ে ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘একেবারে কোনো বিল জমা দেওয়া হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। বিল-ভাউচার দ্রুত দেওয়া ভালো। তবে মেয়াদের মধ্যে জমা দিলেও হবে। আমাদের মেয়াদের এখনো ৬০ দিন বাকি রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অডিট হবে, এর আগেই আমরা বিল-ভাউচার জমা দেব। কারও বিল-ভাউচারে গরমিল থাকলে প্রয়োজনে পকেটের টাকা দিয়ে সেটি পূরণ করা হবে।’

জিএসের পর সর্বোচ্চ বরাদ্দ ক্রীড়া সম্পাদকের

জিএসের পর সবচেয়ে বেশি অর্থ নিয়েছেন ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল থেকে নির্বাচিত রাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। তাঁর নামে সাত ধাপে মোট ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চার ধাপে নেওয়া ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার কোনো ভাউচার জমা হয়নি।

এর মধ্যে রাকসু গেমস বাবদ দুই ধাপে ১২ লাখ ৭২ হাজার ৩৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে। গত মাসে শুরু হওয়া ছয়টি ইভেন্টের রাকসু গেমস চলমান থাকায় এসব অর্থের বিল জমা দেওয়া হয়নি বলে জানান ক্রীড়া সম্পাদক নার্গিস খাতুন।

গত মে মাসে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাবদ দুই ধাপে নেওয়া ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৬ টাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিলটি রেডি করা আছে। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলমান থাকায় জমা দিতে পারিনি। যেকোনো সময় এটি জমা দিয়ে দেব।’

রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর ছয় ধাপে মোট ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি লেনদেনের ভাউচার জমা দিয়েছেন। তবে একটিতে বাজেট ঘাটতি রয়েছে। বাকি ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকার ভাউচার জমা দেওয়া হয়নি।

ইমরান লস্কর বলেন, ‘আমার বাজেট অনেকগুলো ক্লাব ও সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয়। ফলে দুটি কর্মসূচির বিল জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি আজকে বা কালকে বিলগুলো জমা দেব। ঘাটতি বাজেটের বিষয়টি হলো, ওই কর্মসূচিতে খরচ বেশি হয়েছিল। সেটি আমার ল্যাপটপে সংরক্ষিত আছে।’

রাকসুর সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহা তিন ধাপে মোট ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপন বাবদ নেওয়া ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে জাহিদ হোসেন জোহা দাবি করেন, তাঁর কর্মসূচির সব বিল-ভাউচার জমা পড়েছে। একটি কর্মসূচির আরও টাকা উত্তোলন করা বাকি রয়েছে। ফলে সেটি অন্য একটি কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। বাকি সব বিল তিনি জমা দিয়েছেন বলে দাবি করেন।

তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি.এম. নাজমুল সাকিব তিন ধাপে মোট ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ আগস্ট ‘সংশ্লিষ্ট পদ বিষয়ক কর্মশালা’ আয়োজনের জন্য নেওয়া ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ভাউচার জমা হয়নি।

নাজমুল সাকিব বলেন, ‘আমার সবশেষ বাজেটের হিসাব দেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে এই টাকা দিয়ে একটি শিক্ষা সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনারে সব হিসাব বুঝে নিয়ে আগামীকাল বা পরশু আমরা বিল জমা দিয়ে দেব।’

মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম তিন ধাপে মোট ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ আগস্ট প্রকাশনার জন্য নেওয়া ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসা দুই ধাপে মোট ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে গত মে মাসে আয়োজিত নারী উদ্যোক্তা মেলার জন্য নেওয়া ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার কোনো হিসাব জমা পড়েনি।

সায়িদা হাফসা বলেন, ‘আমাদের এই মেলার সঙ্গে ফটো কনটেস্ট আয়োজনের কথা ছিল। তবে সেটি না হওয়ায় বিলটি জমা দেওয়া হয়নি। আমি রাকসু কার্যালয়ে এসেছি এটি নিয়েই কাজ করতে। আগামীকালের মধ্যে জমা দিয়ে দেব।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফা দুই ধাপে মোট ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ জুলাই নেপালে শিক্ষা বিষয়ক একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ বাবদ নেওয়া ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার কোনো হিসাব জমা পড়েনি।

তোফায়েল আহমেদ তোফা বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে উপাচার্যের কাছে সেমিনারে যোগ দিতে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলাম। তবে এটা রাকসুর তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা ছিল না। তবে আমার প্রয়োজনীয় কাগজ আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছি।’

পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ২৬ জুলাই কোনো খাত উল্লেখ না করে ৮২ হাজার টাকা নিয়েছেন। এরও কোনো হিসাবের ভাউচার জমা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার কর্মসূচির অনেক টাকা বেঁচে গেছে। অতিরিক্ত ওই টাকা ফেরতসহ দুই-এক দিনের মধ্যেই ভাউচার জমা দেব।’

এজিএস এস এম সালমান সাব্বির ৫ মার্চ দাপ্তরিক খরচ বাবদ ৬০ হাজার টাকা নেন। তবে এরও কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া নথিতে কম্পিউটার সেট ও প্রিন্টার কেনার জন্য ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই অর্থ কে নিয়েছেন, তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ অর্থেরও কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।

কী বলছেন রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার

রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, কোনো সরকারি ব্যয় অগ্রিম গ্রহণ করা হলে নির্ধারিত সময়ে হিসাব সমন্বয়ের শর্ত থাকে। একটি বিল সমন্বয় করার পরই দ্বিতীয় ধাপে টাকা উত্তোলন করা যায়। সমন্বয় না করে পরবর্তী বিল দাবি করার সুযোগ নেই। কোনো সম্পাদক পূর্ববর্তী বিলের হিসাব সমন্বয় না করে পরবর্তী বিল উত্তোলন করলে সেখানে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে। ভিপি-জিএস অন্য কারও বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করতে পারেন না। তাঁরা নিজস্ব বরাদ্দের বাইরে স্পন্সরশিপ নিয়ে আসতে পারেন। তবে সেটিও ইচ্ছামতো খরচ করার সুযোগ নেই। আর্থিক বিধি অনুযায়ী সব অর্থের হিসাব রাকসুর সভায় উপস্থাপন করতে হবে, যেখানে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ উপস্থিত থাকবেন। অনিয়ম হলে কোষাধ্যক্ষের ফাইল আটকে দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।

যা বলছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ

কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমানের কাছে নথিটির সত্যতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালিকায় নতুন কিছু তথ্য হালনাগাদ হয়েছে। তবে নথিটি কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের এবং অনেক বিল-ভাউচার জমা না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যেকোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। রাকসুর কিছু বিল-ভাউচার এখনো জমা হয়নি। আমরা তাদের সঠিক নিয়মে জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’

রাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো কর্মসূচি আয়োজন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিল-ভাউচারসহ আর্থিক হিসাব জমা দেওয়া উচিত। প্রতিটি সভায় হিসাবের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মনে করিয়ে দিয়েছি। রাকসুর প্রতিনিধিরা একটু সময় চেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো টাকা ব্যয় করলে অবশ্যই বিল-ভাউচার জমা করতে হবে। রাকসুকেও এই প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।’

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

জেনে নিন আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম

জেনে নিন আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সর্বশেষ নির্ধারিত দামেই বুধবার স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে। গত শনিবার স্বর্ণের দাম ভরিতে... বিস্তারিত