ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন সমীকরণ

২০২৬ আগস্ট ১৫ ১৯:২০:৪২

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন সমীকরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। এবার তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা এসেছে ভারতের দিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে।

বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও শেখ হাসিনার ওই সংবাদ সম্মেলন ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এর পাঁচ দিন পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের পর সেদিনই তিনি দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন। দিল্লি পৌঁছে পরদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁকে বৈঠক করতে দেখা যায়।

বাংলাদেশে বৈঠক শেষে দিনেশ ত্রিবেদী ঠিক কী কারণে দিল্লি ছুটে গিয়েছিলেন, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে দুই দেশের সম্পর্কে হঠাৎ তৈরি হওয়া টানটান পরিস্থিতির পেছনে দিল্লির ওই প্রেস ব্রিফিংয়েরও যে ভূমিকা রয়েছে, তা স্পষ্ট। কারণ, ওই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলেছেন।

তবে ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরার যে ঘোষণা শেখ হাসিনা দিয়েছেন, তা বাস্তবে কতটা সম্ভব কিংবা তিনি চাইলেই ফিরতে পারবেন কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরা: স্বেচ্ছায় নাকি প্রত্যর্পণ?

শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তাঁর কাছে বৈধ কোনো পাসপোর্ট নেই। বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া তিনি কীভাবে দেশে ফিরবেন, সেটি একটি প্রশ্ন।

দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

তবে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয়ও সরাসরি বাধা নয়। মূল বিষয় হলো, আগামী ডিসেম্বরে তিনি সত্যিই দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন কি না এবং সে সময় বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশে ফিরতে দেবে কি না।

শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আগেই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফেরত চায়। তবে তাঁর ফেরার সুযোগ কীভাবে তৈরি হতে পারে, সেখানেও দুটি পথ স্পষ্ট।

একটি হলো, তিনি ‘নিজের সিদ্ধান্তে নিজের পছন্দমতো সময়ে’ ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেন। তবে এর জন্য তাঁর বৈধ পাসপোর্ট প্রয়োজন হবে।

পাসপোর্ট না থাকলে ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর এ বিষয়ে বলেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। নিজ দেশে ফিরতে চাইলে সেটি তাঁর অধিকার। একই সঙ্গে পাসপোর্ট পাওয়াও তাঁর অধিকার। তাঁর বৈধ পাসপোর্ট থাকলে তিনি সেটি ব্যবহার করতে পারবেন। না থাকলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ট্রাভেল পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলে তিনি পারমিট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন।

তবে শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে না এলে আরেকটি পথ হলো তাঁর প্রত্যর্পণ। অর্থাৎ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের মামলা’য় অভিযুক্ত বা ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তরের জন্য যে চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া।

তবে ওই চুক্তিতে নানা ফাঁকফোকর রয়েছে। ফলে চাইলেই যে ওই আইনের আওতায় প্রত্যর্পণ হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই; বাধ্যবাধকতাও নেই।

এ ছাড়া বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের দুই বছর পরও যখন এই প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি হয়নি, তখন অদূর ভবিষ্যতে এটি আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

অতীতেও ভারত বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের আশ্রয় দিয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছেন, আবার কেউ কেউ এখনো ভারতে অবস্থান করছেন।

তবে শেখ হাসিনা যেখানে নিজেই ফিরতে চান, সেখানে প্রত্যর্পণ আইন প্রয়োগের প্রয়োজন দেখছেন না জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে অবস্থান করছেন। এটিকে কারাগারের হেফাজত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তিনি নিজেই দেশে ফেরার সদিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সরকারও বলছে, তিনি দেশে ফিরুন, তাঁকে ফেরত পাঠানো হোক।

এলিনা খান বলেন, এ ক্ষেত্রে ভারতের কোনো চুক্তি বা এ ধরনের কোনো সমস্যা আছে বলে তিনি মনে করছেন না। শেখ হাসিনা যদি বলতেন যে তিনি দেশে ফিরবেন না, তাহলে তাঁকে ওই আইনের আওতায় পাঠানোর প্রশ্ন উঠত। কিন্তু তিনি নিজেই আসতে চাইছেন এবং বাংলাদেশ সরকারও তাঁকে ফেরত চাচ্ছে। সুতরাং তাঁর দেশে আসতে কোনো বাধা আছে বলে তিনি মনে করেন না।

শেখ হাসিনা ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কী হবে, তা নির্ভর করছে তিনি কীভাবে ফিরছেন তার ওপর।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, তিনি যদি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ কোনো নেগোসিয়েশন’ করে দেশে আসতে পারেন, তাহলে তাঁর ফেরার পরিস্থিতি হবে একরকম। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সে ধরনের নেগোসিয়েশনের পরিস্থিতি সেভাবে দেখা যাচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

ফলে ‘নেগোসিয়েশন ছাড়াই’ তিনি দেশে ফিরলে তাঁকে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা গ্রেপ্তার হতে হবে। কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে।

এলিনা খান বলেন, আইন সবার জন্যই প্রযোজ্য। তাই শেখ হাসিনা দেশে আসা মাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সময়সীমাও ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। ফলে তাঁকে প্রথমেই হেফাজতে নেওয়া হবে। এরপর আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ চলবে।

দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কিংবা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি রয়েছে-এটি শেখ হাসিনাও নিশ্চিতভাবেই জানেন। তাহলে কেন তিনি দেশে ফেরার কথা বলছেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এখানেই সামনে আসছে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ‘অস্তিত্ব সংকটের’ বিষয়টি। বাংলাদেশে দলটির কার্যক্রম ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনাসহ অন্য নেতারাও পলাতক।

ফলে দলকে বাঁচাতেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন-এমন বক্তব্য রয়েছে দলটির ভেতরে। যদিও তাঁর ফেরার বাস্তবতা দেখছেন না রাজনীতি বিশ্লেষকদের অনেকেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, শেখ হাসিনাকে তিনি আর আগের মতো ‘হিরোইক’ অবস্থানে দেখতে পান না। যেভাবে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, তাতে ওই সাহস নিয়ে তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন বলে মনে করেন না তিনি।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যত জোর গলায়ই বলুন না কেন, আইনি পথে এসব মোকাবিলা করার মতো বাস্তবতা তাঁর নেই। বাংলাদেশেও বিচারব্যবস্থাকে পক্ষপাতহীন এবং প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার বাইরে এসে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থায় দেখা যায় না। এখানে শেখ হাসিনা নিজেও ন্যায়বিচার করেননি। ফলে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন-এই ভরসাও তাঁর নেই। তাই তিনি দেশে আসবেন না বলে মনে করেন সাঈদ ফেরদৌস।

শেখ হাসিনা কি চাইলেই ফিরতে পারবেন?

শেখ হাসিনার দেশে আসা না আসার বিষয়টি শুধু তাঁর একার ওপর নির্ভর করছে না। তিনি যদি সত্যিই বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারেন, এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এর সঙ্গে এখন ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে গেছে। ফলে শেখ হাসিনা চাইলেই এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে ফিরে আসতে পারবেন বলে মনে করেন না সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পেছনে লক্ষ মানুষের সমর্থন ও বড় সংগঠন থাকে এবং তাঁরা সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বা তাতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেন। তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের বিষয়ে একক সিদ্ধান্তের বিষয় থাকে না। অনেক সময় এর সঙ্গে অন্য অংশীদাররাও যুক্ত হয়ে যান।

এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠছে-ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ হিসেবে শেখ হাসিনা ইস্যুকে ব্যবহার করছে?

এম হুমায়ুন কবীর বলেন, ভারত যদি এটিকে দর-কষাকষির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাঁর ধারণা, এর ফল ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে যে ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রেস ব্রিফিংয়ের পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলে বিষয়টি বোঝা যায়। এমন ভাষায় প্রতিবাদ তিনি আগে কখনো দেখেননি। কতটা বিক্ষুব্ধ হলে এমন প্রতিবাদের ভাষা আসতে পারে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। এটি সরকারি পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সরব প্রতিবাদ করেছে।

এম হুমায়ুন কবীর বলেন, এখানে ভারত দর-কষাকষি করেছে-এ কথা তিনি বলবেন না। তবে শেখ হাসিনাকে ব্রিফিং করার একটি সুযোগ হয়তো করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই সুযোগ তৈরি হওয়ার পর যে প্রতিক্রিয়া এসেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরও এগোলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটিরও একটি ইঙ্গিত এতে রয়েছে।

শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত কী করবেন, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে তাঁর সমীকরণ যেমনই হোক, দেশে ফেরার সময়সীমা ঘোষণার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য নতুন করে একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে-এটি স্পষ্ট।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত

ফের দেশের বাজারে বাড়ল সোনার দাম

ফের দেশের বাজারে বাড়ল সোনার দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বাজারে টানা তৃতীয়বারের মতো স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এবার ভরিতে ১ হাজার ১৩৩ টাকা... বিস্তারিত