ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

জন্মভূমি নয়, নজরুলের হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

২০২৬ জুলাই ০২ ১৩:৩০:৪৮

জন্মভূমি নয়, নজরুলের হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ না করলেও তার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশও জাতীয় কবিকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণা করার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে সরকার ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারাদেশে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’ উদযাপন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি স্মারক ডাকটিকিট এবং ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২৭’-এর লোগো উন্মোচন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্ম গ্রহণ করেননি। তবে তার হৃদয় জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশও তাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসে। কিশোরবেলায় ১৯১৪ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন।’

তিনি জানান, কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে সরকার ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

জাতীয় কবির অবদান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।’

তিনি বলেন, ‘পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার তথা যা কিছু অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দর, তার বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। বিপ্লব, বিদ্রোহ কিংবা রণসংগীত, ইসলামী তাহজীব-তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান, ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামাসংগীত, প্রেম-প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।’

মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুলের সাহিত্য ও সংগীতের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনই আমাদের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মূল ভাষা। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ।’

তিনি বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও নজরুল সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ‘এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে গণমানুষ, বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে ‘নজরুল বর্ষ’ শুরু হয়েছে।’

উদ্বোধনী আয়োজন নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘একটি আধুনিক আবদ্ধ ঘরে বসে আজ যেভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করছি, স্মারক ডাকটিকিট এবং লোগো উন্মোচন করছি, এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিকে আমি একটু ভিন্নভাবেই আশা করেছিলাম।’

তিনি বলেন, আমন্ত্রণপত্রে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন এবং নির্বাচিত উপজেলার কর্মকর্তাদের ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে নজরুল গবেষক, নজরুলশিল্পী ও নজরুলপ্রেমীদের সংযুক্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হলে তা আয়োজনের সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয় নজরুল গবেষক, নজরুলশিল্পী ও নজরুলপ্রেমীরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন, তাহলে যেমন তা অনুষ্ঠানের সঙ্গে মানানসই হয় না, একইভাবে নজরুল বর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংযুক্ত থাকার বিষয়টিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন প্রজন্মের নৈতিক বিকাশে নজরুলের সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, নজরুলের কবিতা ও ছড়ায় যে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা রয়েছে, তা নতুন প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা শুধু মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারি অফিসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তার সাহিত্যকর্ম, জীবনবোধ, চিন্তা ও দর্শন মানুষের ঘরে ঘরে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে বছরজুড়ে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুলসংগীতের আসর, প্রকাশনা, নাট্যোৎসব এবং চিত্রপ্রদর্শনীর মাধ্যমে জাতীয় কবির সৃষ্টিকে আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে তার সাহিত্য ও সংগীত সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচারের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি সারাদেশের জেলা, উপজেলা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরুল বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নজরুলপ্রেমীদের সম্পৃক্ত করে বছরব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ এবং আন্তর্জাতিক গবেষকদের কাছে নজরুলের সাহিত্য ও মানবিক দর্শন আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতীয় কবিকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা নজরুল বিশেষজ্ঞ তারা কবিকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেন। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপশক্তি নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালালেও সবাই মিলেমিশে থাকাই বাংলাদেশের মানুষের আবহমানকালের মূল্যবোধ। বর্তমান সরকারও এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে। শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, কোনো প্রাণীও যেন মানুষের হিংস্রতার শিকার না হয়, সরকার সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।’

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, নজরুল গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী ও শিল্পীরা উপস্থিত ছিলেন।

ইমামুল

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত