ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে বাড়ছে চাপ

২০২৬ মার্চ ০৮ ১৯:৩২:৩৩

বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে বাড়ছে চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বাণিজ্য উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বিশেষ করে বৈদেশিক খাত ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির এই অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

রোববার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলীয় সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড (ডিএফএটি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনমিকস ইনসাইটস: গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড এ রাইজ ইন এক্সটার্নাল সেক্টর ভালনারেবিলিটিজ’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর।

প্রবন্ধে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতি ধারাবাহিক কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে এবং বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক সময়ের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্য বিরোধ বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর।

ড. মনসুর আরও বলেন, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নীতিগত অনিশ্চয়তা কিছুটা বেড়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, বৈদেশিক খাতকে স্থিতিশীল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ছে।

তিনি মনে করেন, আর্থিক ও রাজস্ব খাতের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। তাই নতুন সরকারের জন্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার বাস্তবায়ন এবং কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করা এবং টাকার কিছুটা অবমূল্যায়ন প্রয়োজন।

তিনি জানান, দেশের অনেক তৈরি পোশাক কারখানা এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বেশির ভাগ কারখানা মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লোকসানের মুখে পড়ছে। গত সাত মাস ধরে রপ্তানি কমছে এবং জুন পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সত্তার বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তার মতে, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের বৈশ্বিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘের কাছে করা অনুরোধ বর্তমান বাস্তবতায় আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কোভিড–১৯ মহামারির সময় যেমন উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল, তেমনি এবারও এক থেকে দুই বছর সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।

বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ইস্যুর মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, জাপানের সঙ্গে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।

ড. সত্তার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাই অ্যামেরিকান আইন ২০২৫’-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তা দিয়ে তৈরি পোশাক উৎপাদন করে, তাহলে সেই পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান শুল্ক কাঠামোয় কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। প্রস্তাবিত শুল্ক হ্রাস পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৭ হাজার ৫০০ ট্যারিফ লাইনের মধ্যে প্রায় ৫ হাজারটিকে শূন্য শুল্কে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে, যা দেশের বাজারকে আরও উন্মুক্ত করতে পারে।

পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদ বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় বিনিয়োগ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৬ থেকে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে আমদানি ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ানো প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বর্তমান গতিতে নাও থাকতে পারে। তাই আমদানি অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে রপ্তানির দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, নিম্ন মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য সুরক্ষা কমানো, উন্নত লজিস্টিকস, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ প্রাথমিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে এই অবস্থাকে ধরে রাখতে কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং সময়োপযোগী সংস্কার অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (রাজনৈতিক) হ্যারি থম্পসন বলেন, চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশই বৈদেশিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবে সঠিক নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই সংকটের মধ্যেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত