ঢাকা, সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২ মাঘ ১৪৩২

করপোরেট ঋণে কড়াকড়ি, বন্ড মার্কেটে জোর গভর্নরের

২০২৬ জানুয়ারি ২৬ ২০:৩৬:৪৯

করপোরেট ঋণে কড়াকড়ি, বন্ড মার্কেটে জোর গভর্নরের

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকনির্ভর ঋণব্যবস্থা থেকে সরে এসে অর্থনীতিকে নতুন পথে নিতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খেলাপি ঋণের চাপ কমানো এবং বন্ড মার্কেটকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে ঋণ প্রবাহ সীমিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

সোমবার রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিকমেন্ডেশনস’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন গভর্নর। তিনি জানান, ভবিষ্যতে করপোরেট খাতকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে আলাদা করা হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর চাপ কমে।

গভর্নর বলেন, বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে একক ঋণগ্রহীতার সীমা কঠোরভাবে মানা হবে। কোনো ধরনের তদবির বা চাপ গ্রহণ করা হবে না। বর্তমানে কোনো ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত একক গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ ফান্ডেড এবং ১০ শতাংশ নন-ফান্ডেড। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সবুজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে এই সীমা কিছুটা শিথিল রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার বড় পার্থক্য তুলে ধরে গভর্নর বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বন্ড মার্কেট সবচেয়ে বড়, এরপর পুঁজিবাজার এবং সর্বশেষ মানি মার্কেট। অথচ বাংলাদেশে উল্টো চিত্র—এখানে মানি মার্কেট সবচেয়ে প্রভাবশালী। এই কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে সরকার ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের ঋণই হতে পারে বন্ড মার্কেট বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারি ঋণ বন্ডের মাধ্যমে বাজারে এলে বন্ড মার্কেট আরও গভীর ও সক্রিয় হবে। এ কারণে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

মুদ্রাবাজার ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো হচ্ছে না, যা ইতিবাচক দিক। এই পরিস্থিতিতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের বাজার প্রায় ৫–৬ লাখ কোটি টাকা, যা সহজেই সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা সম্ভব। এটি করা গেলে বন্ড মার্কেটের আকার দ্রুত দ্বিগুণ হতে পারে।

বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো সুদসহ অর্থ ফেরত দেবে—এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।

সেমিনারে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পেলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে যেতে আগ্রহী হয় না। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যাংক থেকে দেওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বেড়েছে এবং এখানেই বড় ধরনের কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ট্রেজারি বন্ড সেকেন্ডারি মার্কেটে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে কর আদায়ের সফটওয়্যারগত জটিলতা এখনো রয়ে গেছে। এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সিলিং তুলে দেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের সম্ভাবনা বিশাল। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন এবং এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন।

এমজে/

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত