ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১ মাঘ ১৪৩২
রাজনীতির চাপে থমকে গিয়েছিল ঢাবি ছাত্র তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন
নিজস্ব প্রতিবেদক: তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য, টেলিভিশন টকশো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই বারবার প্রশ্ন উঠেছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হয়েও কেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শেষ করতে পারেননি। তবে এই আলোচনার গভীরে গেলে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি ব্যক্তিগত অযোগ্যতার নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বাস্তবতায় গড়ে ওঠা এক ব্যতিক্রমী জীবনের গল্প।
মাধ্যমিক সনদ অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেক রহমানের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাকেও তার মা বেগম খালেদা জিয়া ও ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেপ্তার করা হয়। কৈশোরেই বাবাকে হারানো এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তার জীবনের গতিপথকে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনের বাইরে নিয়ে যায়।
স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে গৃহবন্দিত্ব এড়িয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা ও একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনের চিত্র তুলে ধরেন। এর পরপরই তাকে ও তার মা বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিকবার গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
শিক্ষাজীবনে তারেক রহমান ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে সে সময় দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও তীব্র সেশনজটের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়ে। ফলে তারেক রহমানের পক্ষে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাজপথে সক্রিয় হন এবং ১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সাধারণ সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত হয়ে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন, যা শেষ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের পতনে সহায়ক হয়।
তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সে সময় ক্যাম্পাসে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা ছিল প্রায় অসম্ভব। কবি জসীমউদ্দীন হলের অফিস সহকারী মামুনুর রাশিদ বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে ক্যাম্পাসে প্রায় সারাক্ষণ আন্দোলন আর গোলাগুলির পরিস্থিতি ছিল। ক্লাস তো দূরের কথা, ক্যাম্পাসে হাঁটাও ছিল ভয়ংকর।’ তিনি জানান, রাজনৈতিক দখল ও সংঘর্ষের কারণে বহু শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষার্থী ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্র শেখর চক্রবর্তী বলেন, ‘সেই সময়ের বড় সমস্যা ছিল সেশনজট। পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশই ছিল না। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ক্লাস ও পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যেত না।’ তিনি জানান, তারেক রহমানের ব্যক্তিগত পড়াশোনা সম্পর্কে তিনি খুব বেশি জানতেন না, তবে সে সময় পড়াশোনার পরিবেশ যে ভয়াবহ ছিল, তা সবাই জানতেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বহু রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব রাজনীতির উদাহরণেও দেখা যায়, নেতৃত্বের জন্য ফরমাল ডিগ্রি অপরিহার্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকাই কোনো অযোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না।’
তারেক রহমানের সরাসরি শিক্ষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী বলেন, এরশাদ শাসনামলের ‘টারময়েল’ পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের পক্ষে নিরাপদে পড়াশোনা চালানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যাম্পাসে অস্ত্র, গোলাগুলি ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের কারণে তার নিরাপত্তা ছিল বড় উদ্বেগের বিষয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অসম্পূর্ণ থাকা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি নয়। বরং তা একটি উত্তাল রাজনৈতিক সময়ের বাস্তব দলিল যেখানে শিক্ষা নয়, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নই জীবনের গতি নির্ধারণ করেছে।
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- ঢাকা ক্যাপিটালস বনাম সিলেট টাইটান্স: বোলিংয়ে ঢাকা-দেখুন সরাসরি (LIVE)
- নোয়াখালী এক্সপ্রেস বনাম রংপুর রাইডার্স: ম্যাচটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- ঢাকা বনাম রাজশাহী: ২৩ বল হাতে রেখেই জয়-দেখুন ফলাফল
- চলছে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বনাম ঢাকা ক্যাপিটালসের খেলা-সরাসরি দেখুন (LIVE)
- নোয়াখালী বনাম রাজশাহী: জমজমাট খেলাটি শেষ-জানুন ফলাফল
- ঢাকা ক্যাপিটালস-সিলেট টাইটান্সের জমজমাট খেলা শেষ-দেখুন ফলাফল
- চিকিৎসা জগতের আলোকবর্তিকা ডা. কোহিনূর আহমেদ আর নেই
- রাজশাহী ওয়ারিয়র্স বনাম চট্টগ্রাম রয়্যালস: খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- সিলেট টাইটানস বনাম রংপুর রাইডার্স- খেলাটি সরাসরি দেখুন (LIVE)
- শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় বড় পদক্ষেপ নিল বিএসইসি
- ডিভিডেন্ড পেতে হলে নজর রাখুন ২ কোম্পানির রেকর্ড ডেটে
- নির্বাচনের পর বাজার আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের
- বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে ঢাবি অ্যালামনাইয়ের শ্রদ্ধা
- মিশ্র সূচকের মধ্যেও বাজারে আশাবাদ অব্যাহত
- মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজের লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হলো