×

ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট

২০২৬ অক্টোবর ১১ ১৩:৩২:২২

দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির মালিকানা ও স্বত্ব নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকলে সেই জমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, দেওয়ানি মামলায় চূড়ান্তভাবে স্বত্ব নির্ধারণের পর রায়ে বিজয়ী পক্ষের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা যাবে।

‘সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলায় এ রায় দেওয়া হয়। জমির মালিকানা ও স্বত্বসংক্রান্ত পৃথক দুটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৯ মে রায়টি দেন।

২২ পৃষ্ঠার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি এ. এফ. এম. সাইফুল করিম।

রিট আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে ছিলেন আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া। বিবাদীপক্ষে ছিলেন মো. নাসির শিকদার ও তাঁর সঙ্গে থাকা আইনজীবী মিতুল ভৌমিক। রাষ্ট্রপক্ষে দায়িত্ব পালন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মির্জা আল মাহমুদ ও আখতার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।

প্রকাশিত রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুর জেলার ৭.২৩ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির মূল মালিক ছিলেন যমুনা চামার ও গয়ানাত চামার। পরবর্তী সময়ে হস্তান্তরের ধারাবাহিকতায় জমিটির মালিক হন অনিল কুমার দত্ত। তাঁর কাছ থেকে দানসূত্রে ছেলে অলোক কুমার দত্ত জমিটির স্বত্ব লাভ করেন। পরে ১৯৯৬ সালের ৮ জুলাই নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে অলোক কুমার দত্ত জমিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বিক্রি করেন এবং তাঁকে দখল বুঝিয়ে দেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদ এ মামলার রিট আবেদনকারী।

অন্যদিকে, মামলার চতুর্থ বিবাদী মো. জাহিদুর রহমানের দাবি, অলোক কুমার দত্ত ১৯৯৬ সালের ২৩ মে তাঁর সঙ্গে জমিটি বিক্রির জন্য একটি বায়নাপত্র করেছিলেন। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তিনি ২০০১ সালে বায়নাপত্রের সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন চেয়ে দেওয়ানি মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর একতরফা ডিক্রি পাওয়ার পর ২০০৩ সালে আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত দলিলের অধিকারী হন তিনি।

ওই রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট ফরিদপুরের জেলা জজ আদালতে টাইটেল আপিল করেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বিলম্ব মার্জনার পর আদালত আপিলটি শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে মো. জাহিদুর রহমান দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন।

বিষয়টি শুনানির পর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আগের আদেশ বাতিল করে আপিল গ্রহণের বিষয়ে নতুন করে শুনানি করতে ফরিদপুরের জেলা জজকে নির্দেশ দেন আদালত।

হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে, ২০২৩ সালের ২৫ মে ফরিদপুরের জেলা জজ আপিলটি গ্রহণ করেন। এ আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে জাহিদুর রহমান ২০২৪ সালে আবার হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন। ওই বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। সেই সিভিল রিভিশন এখনো হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন।

শুনানিতে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী জাকির হোসেন ভূঁইয়া আদালতকে জানান, ১৯৯৬ সালে নিবন্ধিত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমির স্বত্ব পাওয়ার পর থেকে শাহাবুদ্দিন আহমেদ নির্বিঘ্নে জমিটি ভোগদখল করছেন। তাঁর যুক্তি, ২০০১ সালে চুক্তি বাস্তবায়নের যে মামলা হয়েছিল, তাতে শাহাবুদ্দিন আহমেদকে পক্ষ করা হয়নি। এ কারণে ওই মামলার ডিক্রি ও পরবর্তী দলিল আইনি দৃষ্টিতে অকার্যকর। এ ছাড়া আইনের বিধান অনুযায়ী, আগের নিবন্ধিত দলিলটি পরবর্তী দলিলের ওপর প্রাধান্য পাবে।

অন্যদিকে, জাহিদুর রহমানের আইনজীবী মো. নাসির শিকদার বলেন, তাঁর মক্কেলের বায়নাপত্রটি ১৯৯৬ সালের ২৩ মে সম্পাদিত হয়েছিল, যা শাহাবুদ্দিন আহমেদের দলিলের আগের। আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে অর্জিত স্বত্ব ও দলিলের ভিত্তিতেই আপিল ট্রাইব্যুনাল সঠিক রায় দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, অলোক কুমার দত্ত ও জাহিদুর রহমানের মধ্যে বায়নাপত্রের ভিত্তিতে দলিল সম্পাদন নিয়ে ২০০১ সালে যে টাইটেল মামলার রায় ও ডিক্রি হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ ছাড়া অলোক কুমার দত্তের কাছ থেকে শাহাবুদ্দিন আহমেদের জমি কেনার দলিলের সত্যতা ও বৈধতা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। আদালতের মতে, সংক্ষিপ্ত বিচারিক কার্যধারায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। মামলার ঘটনা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্পত্তির অধিকার, মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত বিচারে নিষ্পত্তি করা যাবে না।

আদালত আরও বলেন, বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা ও স্বত্ব আগে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জমিটি শাহাবুদ্দিন আহমেদ কিংবা জাহিদুর রহমান কোনো পক্ষের অনুকূলেই অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা উচিত হবে না। এসব পর্যবেক্ষণসহ উভয় রুল নিষ্পত্তি করেন হাইকোর্ট।

রায়ে ফরিদপুরের ডেপুটি কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সিভিল রিভিশন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন থাকায় উচ্চ আদালতের আইনি লড়াইয়ে শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও জাহিদুর রহমানের মধ্যে যে পক্ষের অনুকূলে জমির মালিকানা নির্ধারিত হবে, সম্পত্তিটি সেই পক্ষের অনুকূলে অবমুক্ত করতে হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জমির দখল নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বলা হয়েছে।

ইএইচপি

পাঠকের মতামত:

ডুয়ার ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

সর্বোচ্চ পঠিত