ঢাকা, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো নিশ্চিত হয়নি: মতিউর রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক: গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ৬৪ বছর পরও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবিতে তাঁকে কথা বলতে হচ্ছে। বিএনপি সরকারের প্রতি গণমাধ্যম সংস্কারের জরুরি কাজ অবিলম্বে শুরু করার আহ্বানও জানান তিনি।
আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক নির্ধারিত বক্তৃতায় এসব কথা বলেন মতিউর রহমান।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন আগামীকাল সোমবার শেষ হবে।
বক্তৃতার শুরুতে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির কথা স্মরণ করেন মতিউর রহমান। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সেখানে কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন দাবি ছিল। নিজের অংশগ্রহণের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই বিক্ষোভে আমি নিজেও অংশ নিয়েছিলাম। এরপর বহু আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও মূল বিষয়গুলো একই জায়গায় থেমে আছে। দুঃখ হলো সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনকে অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন মতিউর রহমান। তবে প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি এবং কোনো কোনো কমিশনের প্রস্তাবও আলোর মুখ দেখেনি।
সে সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করাও কঠিন ছিল বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলো সম্পাদক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নানা চাপ ও ভয়ের কারণে অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মালিকানা বদলেছে, অনেক সম্পাদকের জায়গায় নতুন ব্যক্তি এসেছেন এবং অনেক সাংবাদিককে কাজ ছাড়তে হয়েছে।
প্রথম আলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, পুরো সময়ই ভয়ের পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকি ছিল। প্রথম আলো ও অন্য একটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে দেশ-বিদেশ থেকে বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার চালানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে প্রায় সাত দিন বিক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রায় সারা রাত প্রথম আলো কার্যালয়ে আগুন জ্বলেছে এবং লুটপাট হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সময়মতো এবং যথেষ্ট শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসেনি। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও তাদের সরাসরি কঠোর নির্দেশ দেননি। পরে আরেকটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ও অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, ওই কমিশনের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব নিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের মধ্যে ইতিবাচক ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার ‘সামান্যতম’ উদ্যোগও নেয়নি।
শেখ হাসিনার আমলের অভিজ্ঞতা
শেখ হাসিনার শাসনামলে স্বাধীন সাংবাদিকতার সুযোগ ভীষণ সংকুচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। তাঁর বক্তব্য, সাংবাদিক ও সম্পাদকদের জেলে যেতে হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রচারসংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে ও সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশি-বিদেশি বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপনও বন্ধ করা হয়েছিল। প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ৮০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
মতিউর রহমান জানান, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা প্রথম আলোর মালিকানা ছেড়ে দিতে কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছিল। এর পেছনে সম্পাদককে সরানো এবং মালিকানা একটি অর্থ পাচারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি দাবি করেন। এসব শেখ হাসিনার নির্দেশেই হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বিএনপি সরকারের কাছে প্রত্যাশা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি ভালো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৯ বছর পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, ১৯৯১–’৯৬ ও ২০০১–’০৬ সালে বিএনপির দুই আমলে তিনি প্রথমে একটি সংবাদপত্র এবং পরে প্রথম আলোর সম্পাদক ছিলেন। তখন সরকারের অনেক নীতির কঠোর সমালোচনা করেও কোনো হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়নি বলে জানান তিনি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে তর্ক হলেও সে কারণে শাস্তি পেতে হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তখন তর্ক হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিএনপি সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারেও নির্ভীক সাংবাদিকতার সুরক্ষা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের মতো প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনাও হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব’
প্রতিশ্রুতি থাকলেও সংস্কারে এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। তাঁর বক্তব্য, মিডিয়া কমিশন গঠন নিয়ে একটি মতবিনিময় বৈঠকের পর আর কিছু শোনা যায়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পুরোনো বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি নেই।
কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ও পরিবর্তনের কথা শোনা গেছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অনিশ্চয়তা ও চাপের কথা বলছেন এবং সংবাদ ও মতামত প্রকাশে অনেক ক্ষেত্রে স্বনিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কিছু প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বক্তব্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
সরকার মাত্র সাত মাস পার করেছে এবং হাতে এখনো অনেক সময় আছে এ কথা উল্লেখ করে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘দল ও সরকারকে এখনই সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যম বিষয়ের জরুরি কাজগুলো শুরু করতে হবে। নইলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।’
বক্তৃতার শেষ দিকে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির সেই দিনের কথা আবার স্মরণ করেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার সেই ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালের কথা বারবার মনে পড়ে যায়। সেদিন আমরা দাবি তুলেছিলাম, কথা বলার অধিকার দিতে হবে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিতে হবে। নানা আন্দোলন ও সংগ্রামের মুখে বারবার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু মূল বিষয়গুলো আগের জায়গাতেই স্থবির হয়ে আছে। দুঃখ হলো সে দাবিতে এখনো আমাদের কথা বলতে হয়। দাবি জানাতে হয়।’
ইএইচপি
পাঠকের মতামত:
সর্বোচ্চ পঠিত
- একসঙ্গে ৬৮ এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার করল সরকার, দেখুন তালিকা
- ৩৯ পদে ১০০ জনকে নিয়োগ দেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- ৪৩ পদে নিয়োগ দেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, আবেদন অনলাইনে
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (২৯ সেপ্টেম্বর)
- একাদশে দ্বিতীয় ধাপে আবেদনের সুযোগ, আবেদন করবেন যেভাবে
- ওয়ালটনে টেরিটরি সেলস ম্যানেজার পদে নিয়োগ
- এইচএসসি পাসেই ৪৭ পদে চাকরি দেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
- মাসে ৩৫শ রিঙ্গিত বৃত্তিতে মালায়ায় পিএইচডির সুযোগ
- বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকে চাকরি, আবেদন ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত
- অক্টোবরে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা মন্ত্রণালয়ের
- ১ অক্টোবর ফেনী সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
- আজকের বাজারে স্বর্ণের দাম (৩০ সেপ্টেম্বর)
- চার জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ
- আইএফআইসি ব্যাংকের অনুদান-বৃত্তি পেলেন ঢাবির ৮০ শিক্ষার্থী
- শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার বিশ্ববিদ্যালয় হবে ডিসিইউ: উপাচার্য